একদিনের উত্থানেও ফিরছে না বিনিয়োগকারীদের আস্থা
টানা চার কার্যদিবসে ১৩৩ পয়েন্ট হারানোর পর একদিনে ৫৭ পয়েন্টের উত্থানেও স্বস্তি ফিরছে না দেশের শেয়ারবাজারে। বুধবার (০৪ নভেম্বর) প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মূল্যসূচক বাড়লেও লেনদেনের পরিমাণ কমেছে।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধির পরও বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সাময়িক এই উত্থানের পর আবারও ধারাবাহিক দরপতন শুরু হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিও দেখছেন তারা।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, টানা চার দিনের পতনে সূচক ১৩৩ পয়েন্ট কমার পর মাত্র একদিনে ৫৭ পয়েন্টের কিছু বেশি বৃদ্ধি বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ অতীতেও একদিন সূচক বাড়ার পর পরবর্তী কয়েক কার্যদিবসে ধারাবাহিক পতনের ঘটনা ঘটেছে। ফলে বুধবারের উত্থান কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
তাদের আশঙ্কা, বৃহস্পতিবার থেকেই বাজার আবারও নিম্নমুখী ধারায় ফিরে যেতে পারে। চলমান পরিস্থিতিতে দরপতন অব্যাহত থাকলে প্রধান সূচক ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এটি বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস নয়।
বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বর্তমান কমিশন শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক দরপতন চললেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মতে, বর্তমান কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা কেবল একদিনের সূচক বৃদ্ধির মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়।
তারা বলেন, বর্তমান কমিশনের দায়িত্ব পালনকালে একপর্যায়ে ডিএসইর প্রধান সূচক প্রায় ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। সে সময় বাজারে লেনদেনের পরিমাণও সন্তোষজনক পর্যায়ে ছিল। বাজারের ইতিবাচক প্রবণতায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকে বাজারের প্রতি আস্থা ফিরে পেয়ে বিনিয়োগেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক দরপতনের কারণে সেই ইতিবাচক পরিস্থিতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বরং সূচক ও শেয়ারদরের ক্রমাগত পতনে বাজার আবারও নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। এতে বর্তমান কমিশনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০১০ সালের শেয়ারবাজারের মহাধসের আগের অবস্থার তুলনা করছেন। তাদের ভাষ্য, ২০১০ সালের বড় ধরনের ধসের আগে দেশের শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেন অস্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছেছিল। বাজারের সেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আকৃষ্ট হয়ে বিপুলসংখ্যক নতুন বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ দরপতনে অনেক বিনিয়োগকারী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
তাদের মতে, বর্তমান কমিশনের সময়েও প্রথমদিকে বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে টানা পতন সেই প্রত্যাশাকে হতাশায় পরিণত করেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বিনিয়োগকারীকে ২০১০ সালের অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাজারে সাময়িক স্থিতিশীলতা ও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও পরবর্তী দরপতনে তারা আবারও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ কারণে বর্তমান কমিশনের অধীনে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে—এমন বিশ্বাস অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যেই আর অবশিষ্ট নেই।
তাদের মতে, কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজারে সূচক ও লেনদেন বৃদ্ধির যে ইতিবাচক চিত্র তৈরি হয়েছিল, ধারাবাহিক দরপতন সেই অর্জনকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। বাজার সংস্কার, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেগুলোর প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
এ অবস্থায় বর্তমান কমিশনের পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ। তাদের বক্তব্য, বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে কমিশনের উচিত দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো। তাদের মতে, সম্মানজনক অবস্থান বজায় রেখেই বর্তমান কমিশনের পদত্যাগ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বাজারে সক্রিয় কারসাজি চক্রের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের অভিযোগ, শেয়ারবাজারে এখনো বিভিন্ন কারসাজি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের প্রভাবেই অনেক ক্ষেত্রে বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট তদন্তের ফলাফল কিংবা সংশ্লিষ্ট কারসাজি চক্রের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এগুলো বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ও মূল্যায়ন।
ডিএসইতে তিন সূচকের উত্থান
এদিকে বুধবার (০৪ নভেম্বর) সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মূল্যসূচকের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইর তিনটি সূচকই বেড়েছে। পাশাপাশি লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, এদিন ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৫৭ দশমিক ৩১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৩৪১ দশমিক ৬৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
অন্য দুই সূচকের মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৬ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৩৬ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এ ছাড়া বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ১৫ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৭ দশমিক ৬১ পয়েন্টে।
অর্থাৎ টানা পতনের পর বুধবার ডিএসইর সব সূচকেই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
দাম বেড়েছে ২৮২ প্রতিষ্ঠানের
বুধবার ডিএসইতে মোট ৩৮৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নিয়েছে।
এর মধ্যে ২৮২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ৫১টির এবং ৫০টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
এ হিসাবে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে। অন্যদিকে প্রায় ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের দর কমেছে এবং প্রায় ১৩ দশমিক ০৫ শতাংশের দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
অর্থাৎ শেয়ারদরের উত্থানের ক্ষেত্রে বুধবার বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা ছিল। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দর বাড়লেও লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাজারের এই উত্থান কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
সূচক বাড়লেও ডিএসইতে লেনদেন কমেছে ৪৩ কোটি টাকা
বুধবার ডিএসইতে মোট ৫২২ কোটি ২৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন কমেছে ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে লেনদেন কমেছে প্রায় ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সূচকের উত্থানের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু বুধবার অধিকাংশ শেয়ারের দাম ও সূচক বাড়লেও টাকার অঙ্কে লেনদেন কমেছে।
ফলে এই উত্থানের মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আসছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সিএসইতে সূচক বাড়লেও লেনদেনে বড় পতন
দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) বুধবার সূচকের উত্থান হয়েছে। তবে ডিএসইর মতো এখানেও লেনদেনের পরিমাণ কমেছে।
এদিন সিএসইতে মোট ৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে সিএসইতে লেনদেন কমেছে ৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে এই পতন প্রায় ৬৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
এদিন সিএসইতে মোট ১৪৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ৮১টির দাম বেড়েছে, ৪১টির দাম কমেছে এবং ২৫টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
অন্যদিকে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১০০ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৩১৫ দশমিক ৩৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
আগের কার্যদিবসে এই সূচক ১৭৪ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট কমেছিল।
অর্থাৎ আগের দিনের বড় পতনের পর বুধবার সিএসইর সূচক কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও লেনদেনের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য সংকোচন দেখা গেছে।
সাময়িক উত্থান নয়, স্থায়ী স্থিতিশীলতা চান বিনিয়োগকারীরা
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, একদিনের সূচক বৃদ্ধি শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক হলেও দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটাতে তা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে ধারাবাহিক পতনের পর সাময়িক উত্থান এবং পরবর্তী সময়ে আবারও দরপতনের প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
তাদের বক্তব্য, বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু সূচকের সাময়িক বৃদ্ধি দেখতে চান না। তারা এমন একটি বাজার প্রত্যাশা করেন, যেখানে স্বাভাবিক চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে শেয়ারদর নির্ধারিত হবে, কারসাজি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি থাকবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।
এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কেবল সংস্কারের ঘোষণা কিংবা আশ্বাস নয়, বাস্তবভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
বুধবারের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসই ও সিএসই উভয় শেয়ারবাজারেই সূচক বেড়েছে এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে দুই বাজারেই টাকার অঙ্কে লেনদেন কমেছে।
ফলে দিনের ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী কার্যদিবসগুলোতে সূচক ও লেনদেনের ধারাবাহিক উন্নতি না হলে বুধবারের উত্থানও আগের মতো সাময়িক হয়ে পড়তে পারে। আর সে ক্ষেত্রে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
