শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
এক্সক্লুসিভ

ইস্যু ম্যানেজমেন্ট’ থেকে মুনাফার আশায় নিজস্ব পোর্টফোলিও পরিচালনা, শেয়ার কেনাবেচায়

শেয়ারবাজারে যখন দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের তীব্র সংকট বিরাজমান, ঠিক তখন ৬৬টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মার্চেন্ট ব্যাংকের চরম নিষ্ক্রিয়তার চিত্র ফুটে উঠেছে। গত প্রায় দুই বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিও নতুন কোনো আইপিও বাজারে আনতে সক্ষম হয়নি। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছানোয় ব্যবসায়িক ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে, অথচ ইক্যুইটি মার্কেটের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের বিকল্প পথটি এখনো স্থবির। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পরও প্রাথমিক বাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি, যা সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
বিএসইসির সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০১০ সালের পাবলিক ইস্যু রুলস অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৪২টি মার্চেন্ট ব্যাংক একটি কার্যকর আইপিও প্রস্তাবও জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রতি দুই বছরে অন্তত একটি করে আইপিও বাজারে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর ধরে অনেক মার্চেন্ট ব্যাংক তাদের মূল দায়িত্ব ‘ইস্যু ম্যানেজমেন্ট’ থেকে সরে গিয়ে সহজ মুনাফার আশায় নিজস্ব পোর্টফোলিও পরিচালনা, শেয়ার কেনাবেচা ও প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মতো কাজে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। এই প্রবণতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার ফলেই আজ পুরো খাতটি অচলাবস্থার মুখে পড়েছে।
আইপিও কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর নিজেদের আর্থিক অবস্থাও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। শীর্ষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রায় স্থবির। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ে যাচ্ছে, এমনকি নিয়মিত বেতন পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে। খোদ মার্চেন্ট ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নতুন কমিশনের নীতিগত কঠোরতার কারণে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহসংক্রান্ত আবেদন বাতিল বা প্রত্যাহার হয়েছে। বিএসইসির কঠোর অবস্থানের কারণে অনেক কোম্পানি ও ইস্যু ম্যানেজার নতুন করে আইপিও আবেদন করতেও সাহস পাচ্ছে না।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের এই ব্যর্থতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। গত এক বছরে ভারতে ৩৭৩টি আইপিও ও এসএমই লিস্টিং সম্পন্ন হলেও বাংলাদেশে সেই সংখ্যা শূন্য। চলমান সংকট থেকে উত্তরণে বিএসইসি জানিয়েছে, মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার সংক্রান্ত বিধিমালা হালনাগাদের কাজ চলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অদক্ষ ও নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিমত—আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় গতি আনা এবং কেবল দক্ষ ও সক্রিয় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে বাজারে টিকিয়ে রাখাই এই দীর্ঘস্থায়ী খরা কাটানোর একমাত্র পথ। তা না হলে উদ্যোক্তারা চড়া সুদের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বেসরকারি খাত ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *