বুধবার, জুলাই ২২, ২০২৬
এক্সক্লুসিভ

বেক্সিমকোর শেয়ার কারসাজিতে জড়িত ৮ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান

সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করে বেক্সিমকোর শেয়ারে কারসাজির মাধ্যমে চার ব্যক্তি ও চার প্রতিষ্ঠান মিলে গড়ে ওঠা একটি চক্র হাতিয়ে নিয়েছে ৩১৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। একই সময়ে চক্রটি ৫২৬ কোটি টাকা ‘আনরিয়ালাইজড গেইন’ করেছে। বিষয়টি উঠে এসেছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) একটি তদন্ত প্রতিবেদনে। তবে ২০২২ সালে এ তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হলেও এতদিন তা ধামাচাপা দিয়ে রাখা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, পুজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তৎকালীন চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এবং শেখ হাসিনা সরকারের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি বিএসইসি সূত্রে বিষয়টি জানা গেছে।

ডিএসইর তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেয়ার কারসাজিকারী চক্রটির চার ব্যক্তি হলেন আব্দুর রউফ, মোসফেকুর রহমান, মারজানা রহমান ও মমতাজুর রহমান এবং প্রতিষ্ঠানটি চারটি হল জুপিটার বিজনেস, অ্যাপোলো ট্রেডিং লিমিটেড, ক্রিসেন্ট লিমিটেড ও ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২ জানুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত বেক্সিমকোর শেয়ারের লেনদেন মূল্য ছিল ৪ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসে ভিন্ন ভিন্ন ক্লায়েন্ট কোডের মাধ্যমে এর ৭০ শতাংশের বেশি লেনদেন করেছে এই আট বিনিয়োগকারী। এর মাধ্যমে চক্রটি মুনাফা তুলে নিয়েছে ৩১৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আর এ সময় তাদের আনরিয়ালাইজড গেইন (অবিক্রীত শেয়ার কেনা দামের চেয়ে মূল্য বেশি ছিল) ৫২৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

জানা গেছে, ২০২২ সালে জুপিটার বিজনেস ও ট্রেডেনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল বিমান প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার অধিগ্রহণের পর পরিচালনা পর্ষদে ঢোকে। দুটি কোম্পানি ফারইস্টের বোর্ডে তাদের প্রতিনিধিত্বের জন্য বেক্সিমকো গ্রুপের সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের মনোনীত করে। ট্রেডেনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল বেক্সিমকো গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা জামানুল বাহারকে মনোনীত করে। অন্যদিকে জুপিটার বিজনেস বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা আলী নওয়াজ ও বেক্সিমকো টেক্সটাইলের জেনারেল ম্যানেজার মাসুম মিয়ার নাম সুপারিশ করে।

ডিএসইর অনুসন্ধান অনুসারে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯-এর ধারা ১৭-এর বেশ কয়েকটি উপধারা লঙ্ঘন করে চক্রটি শেয়ার কারসাজি করেছে। ধারা ১৭ লঙ্ঘন একটি ফৌজদারি অপরাধ। সুবিধাভোগী বিনিয়োগকারী আব্দুর রউফ ছিলেন ইউনাইটেড সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী। অন্যদিকে ক্রিসেন্ট লিমিটেড প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। মোসফেকুর রহমান, মমতাজুর রহমান অ্যান্ড দেওয়ার অ্যাসোসিয়েটস জুপিটার বিজনেস, অ্যাপোলো ট্রেডিং, মারজানা রহমান এবং ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল জনতা ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের বিনিয়োগকারী ছিলেন। এই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কেউ কেউ গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজ, বেক্সিমকো সিকিউরিটিজ, শেলটেক ব্রোকারেজ এবং আইসিবি সিকিউরিটিজের সঙ্গে আলাদা বিও অ্যাকাউন্টও রেখেছিলেন। তারা বেক্সিমকো শেয়ারে সার্কুলার লেনদেন করেছিল, যেখানে কিছু বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করেছে এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যরা ভুয়া সক্রিয় ট্রেডিং দেখাতে একাধিক লেনদেনে এসব শেয়ার কিনেছে।

ডিএসইর অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ক্রিসেন্ট লিমিটেড বেক্সিমকো শেয়ারের শীর্ষ ক্রেতা ছিল। ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালক ও যুগ্ম অপারেটর আব্দুর রউফ চারটি বিও অ্যাকাউন্ট দিয়ে শেয়ার লেনদেনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। এই ৪টি বিও অ্যাকাউন্টের মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৩.২৫ শতাংশ। জুপিটার বিজনেস লিমিটেড দ্বিতীয় শীর্ষ ক্রেতা ছিল। মোসফেকুর রহমান সক্রিয়ভাবে সাতটি বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্যবসায় অংশ নেন। আট বিনিয়োগকারীর গ্রুপ যৌথভাবে বেক্সিমকো শেয়ারের ২৪.৬১ শতাংশ লেনদেন করেছে।

একই ব্যক্তিরাই শীর্ষ বিক্রেতাদের মধ্যেও ছিলেন। একদিকে তারা শেয়ার কিনেছেন, অন্যদিকে সেগুলো বিক্রিও করেছেন। এসব কিছু করা হয়েছে স্রেফ স্টকটিকে সক্রিয় দেখানোর জন্য।

এদিকে সিকিউরিটিজ বিধি লঙ্ঘন ও কারসাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ থাকা আব্দুর রউফ নিজেকে বেক্সিমকো গ্রুপের একজন কর্মচারী এবং গ্রুপের ইনস্যুরেন্স কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন বলে দাবি করেন। শেয়ার কারচুপির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। শুধু কম্পানির লোকেরাই এ বিষয়ে আরো তথ্য দিতে পারবে।’

কোম্পানির নামে খোলা বিও হিসাব অনুযায়ী আব্দুর রউফকে ক্রিসেন্ট লিমিটেডের যুগ্ম পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় কিছু নথিতে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, তবে আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।

ডিএসইর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বেক্সিমকো শেয়ার কারসাজি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯-এর ধারা ১৭-এর বেশ কয়েকটি উপধারা লঙ্ঘন করেছে। ধারা ১৭ লঙ্ঘন অনুযায়ী এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *