রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২৬
আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার

তেলের দাম ও বন্ডের ইয়েল্ড বাড়ায় বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে অস্থিরতা

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে শুক্রবার এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। এসব তথ্য থেকে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সুদের হার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার ধরে রাখতে হতে পারে—এমন আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডসহ বড় অর্থনীতির সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড দ্রুত বেড়ে যায়।

শুক্রবার বন্ডের ইয়েল্ড কিছুটা কমলেও বাজারে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দুই প্রধান বেঞ্চমার্কের দামও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংকট নিরসনে এখনো কোনো সমঝোতা না হওয়া এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও সেনা পাঠাচ্ছে। এর মধ্যে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী ও এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজের বহর আগামী মাসে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ওই অঞ্চলে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় জ্বালানির দাম বাড়তি থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিবর্তে তা উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে কিংবা প্রয়োজনে বাড়াতে পারে। আর সুদের হার দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।

ফরেক্স ডটকমের ফাওয়াদ রাজাকজাদা বলেন, বন্ডবাজার এখন জুন ২০২৭-এর মধ্যে ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে আরও চার দফা সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করছে। বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরুর আগে বাজারের প্রত্যাশা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন; তখন একই সময়ের মধ্যে অন্তত ১০০ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার কমার প্রত্যাশা ছিল।

তিনি আরও জানান, গত এক বছরে ব্লুমবার্গ কমোডিটি ইনডেক্স ৩৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তার মতে, পণ্যের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে নতুন করে পণ্যমূল্যনির্ভর মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি হতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সুদের হার নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে ইতিবাচক লেনদেন হলেও এশিয়ার শেয়ারবাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। শুক্রবার হংকংয়ের বাজারে ২ শতাংশের বেশি দরপতন হয়েছে। টোকিও, সিঙ্গাপুর, ওয়েলিংটন, ম্যানিলা ও জাকার্তার বাজারও কমেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া, সিডনি ও তাইপের বাজার ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের নন-ফার্ম পেরোলস বা কৃষি খাতের বাইরের কর্মসংস্থানের তথ্যের দিকে। এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের শক্তি সম্পর্কে ধারণা দেবে এবং ফেডের পরবর্তী সুদের হার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও বৈশ্বিক এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। এতে সুদের হার কমানোর সুযোগ সীমিত হতে পারে এবং ঋণের ব্যয় তুলনামূলক বেশি থাকলে ব্যাংকঋণনির্ভর ব্যবসা ও বিনিয়োগে চাপ তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের ইয়েল্ড ও বৈশ্বিক সুদের হার বেশি থাকলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ ও উচ্চ-ফলনশীল সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এর ফলে উদীয়মান বাজারগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন কমে গেলে সেটিও বাজারের তারল্য ও বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে বাংলাদেশের বাজারে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে জ্বালানি তেলের দাম কত দিন উচ্চ পর্যায়ে থাকে, বৈশ্বিক সুদের হার কোন পথে যায়, দেশের মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণের ওপর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনের দরপতনকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে সরাসরি একই মাত্রার পতনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।

দেশীয় বাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ব্যাংক, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিল্প ও আমদানিনির্ভর কোম্পানিগুলোর ব্যয় এবং মুনাফার সম্ভাব্য পরিবর্তন। অন্যদিকে রপ্তানিমুখী কিছু কোম্পানি বৈদেশিক মুদ্রার আয় থেকে সুবিধা পেলেও বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেলে তাদের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

ফলে আগামী কয়েকটি লেনদেন দিবসে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের গতিপ্রকৃতি, জ্বালানি তেলের দাম, বন্ডের ইয়েল্ড, ডলার ও সুদের হার-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যের দিকে বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে। একই সঙ্গে দেশের মূল্যস্ফীতি, সুদের হার ও তারল্য পরিস্থিতিও বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে বৈশ্বিক বাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেখছেন না বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার গত কয়েক বছর ধরেই নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ফলে বর্তমান বৈশ্বিক চাপ বাজারের জন্য নতুন একটি চ্যালেঞ্জ হলেও, এর প্রভাব সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেশীয় বাজারের রয়েছে। বরং বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক গতি ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *