সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
অনুসন্ধানী রিপোর্ট

নর্দার্ণ ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে নানা অনিয়মের অভিযোগ, ৮২ কোটি টাকার এফডিআর নিয়ে প্রশ্ন

নর্দার্ণ ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির বিরুদ্ধে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ না করা, ভূয়া এজেন্ট কমিশন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা অর্থ আত্মসাৎ, আইন লঙ্ঘন করে বাকি ব্যবসা করা এবং বিনিয়োগে বিশাল ঘাটতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ (বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) ও বিশেষ নিরীক্ষা দলের পরিদর্শনে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অনলাইন রেজিস্টার পরীক্ষা করে নর্দার্ণ ইন্স্যুরেন্সের এমন ২২টি ফায়ার পলিসি চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর বিপরীতে কোনো ব্যাংক গ্যারান্টি নেই। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এ সংক্রান্ত মানি রিসিটের অর্থের সাথে ব্যাংক স্টেটমেন্টে জমা হওয়া অর্থের কোনো মিল পাওয়া যায়নি যা রাজস্ব আত্মসাতের ইঙ্গিত দেয়।

৭৪৭টি এফডিআরের টাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানির ৮৮২টি স্থায়ী আমানত (এফডিআর), যার পরিমাণ ৯৫ কোটি ৯২ লাখ ৮৪ হাজার ১৮০ টাকা এর বিপরীতে ব্যালেন্স নিশ্চিতকরণের জন্য অনুরোধ পাঠানো হয়। এর মধ্যে ১৩৫টি এফডিআরের, মোট ১৩ কোটি ৩৭ লাখ ৫৫ হাজার ৫০৯ টাকার নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও বাকি ৭৪৭টি এফডিআরের মোট ৮২ কোটি ৫৫ লাখ ২৮ হাজার ৬৭১ টাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট এফডিআর স্টেটমেন্ট ও ইন্সট্রুমেন্ট নিরীক্ষক পর্যালোচনা করেছেন।

নর্দার্ণ ইন্স্যুরেন্সের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি উন্মোচিত হয়েছে এজেন্ট কমিশন খাতে। বিশেষ নিরীক্ষা ও আইডিআরএ-র তদন্তে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিষ্ঠানে চেক ছাড়া নগদ টাকা উত্তোলন, এজেন্ট কমিশন পরিশোধ করা হয়েছে একাউন্ট পেয়ী চেক ছাড়া সম্পূর্ণ নগদে যা বীমা আইন লঙ্ঘন।

বীমা দাবি আটকে রাখার গুরুতর অভিযোগ

প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ন্যায্য বীমা দাবি আটকে রাখার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের দায়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হয়েছে কোম্পানিকে। সরকারি সিকিউরিটিজ বন্ড আইনে কমপক্ষে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ না মেনে ১ দশমিক ০৭ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে। লঙ্ঘন করা হয়েছে ‘জেড’ ক্যাটেগরির নিয়মও।

অব্যাহতি নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাচ্ছে না প্রাপ্য অর্থ

চাকরি থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাপ্য অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছে না নর্দার্ণ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানির সাবেক কর্মকর্তা তাঁর জমানো গ্রাচ্যুয়িটির প্রায় ৮ লাখ টাকা দীর্ঘদিন ধরে পাওনা থাকলেও তা পরিশোধ করছে না নর্দার্ণ ইন্স্যুরেন্স।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, যেসব কর্মকর্তা কোম্পানির বিরুদ্ধে পাওনা আদায়ের জন্য মামলা করেছে এবং আইনজীবীর মাধ্যমে নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন। কোম্পানি পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে পাওনা টাকা পরিশোধ করেছে। কিন্তু যারা মামলা করেননি, পাওনা আদায়ের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেননি, তাদের অনেকেই এখন পর্যন্ত প্রাপ্য টাকা পাননি। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে লিখিত আবেদন করেছি। আইডিআরএ থেকে বিষয়টি নিয়ে কোম্পানির কাছে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। কোম্পানি এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি।

৮৯.২৪ কোটি টাকার বাকী ব্যবসার তথ্য

কোম্পানি পরিদর্শন প্রতিবেদনে ৮৯.২৪ কোটি টাকার বিশাল বাকী ব্যবসার তথ্য এসেছে, যা মূলত অর্থ আত্মসাৎ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বকেয়া প্রিমিয়াম রেজিস্টার অনুযায়ী বকেয়া প্রিমিয়াম ১ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা, বার্ষিক প্রতিবেদনে লুকিয়ে রাখা হয়েছে যা প্রকাশ করা হয়নি। উদ্যোক্তা মূলধন ঘাটতির অংশের পরিশোধিত মূলধন ১৪ দশমিক ৩২ কোটি টাকা হওয়ার কথা থাকলেও এতে ৯ দশমিক ৬৮ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি রয়েছে। বিনিয়োগে ঘাটতি পরিদর্শকদের হিসাবে বিনিয়োগ থাকার কথা ১৫৭ দশমিক ২৮ কোটি টাকা, বাস্তবে রয়েছে ১৪৯ দশমিক ৯৮ কোটি টাকা। ঘাটতি ৭ দশমিক ৩ কোটি টাকা)।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে মাত্র ৪১ জন এজেন্টের নামে রেকর্ড ১৫ দশমিক ০৬ কোটি টাকা কমিশন বাবদ দেওয়া হয়েছে। আইডিআরএ-র নিয়ম ভেঙে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে কোম্পানির ৩ কর্মকর্তার নামে ৮২ দশমিক ৫৩ লাখ টাকা কমিশন দেওয়া হয়। কিন্তু এসব কর্মকর্তার কোনো ব্যাংক একাউন্ট নেই এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টে এ সংক্রান্ত কোন তথ্য নেই।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুস্পষ্ট নির্দেশনা অমান্য করে নর্দার্ণ ইন্স্যুরেন্স ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত ৭৪টি তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা পলিসি ইস্যু করেছে। এছাড়া আরও ১২৭টি অবৈধ ওপেন কভার নোট ইস্যু করার প্রমাণ পাওয়া গেছে যা বীমা আইন লঙ্ঘন।

২০২০ সালে ৪৪ জন এজেন্টের নামে কমিশন দেখানো হলে ২২ জনেরই কোনো হালনাগাদ লাইসেন্স ছিল না। ১৩ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা কমিশনের মধ্যে ৪৪ জনের নামে দেখানো হয় ৯ দশমিক ৯০ কোটি টাকা। বাকি ৩ দশমিক ৮৪ কোটি টাকা কোথায় ও কাকে দেওয়া হলো তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

এছাড়া নিরীক্ষা অনুযায়ী ২০১৪ সালে ১.৪৫ কোটি এবং ২০১৫ সালে ৭১ লাখ টাকা কাকে কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, তা পুরোপুরি অস্পষ্ট। কোন খাতে এই টাকা ব্যয় করা হয়েছে তার কোন উল্লেখ নেই। ২০১৩ সালে ১০৫ জন, ২০১৪ সালে ৪৭ জন এবং ২০১৫ সালে ৪৫ জন এজেন্টকে মোট ১১ দশমিক ১৭ কোটি টাকা কমিশন দেওয়া হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে নর্দার্ণ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে এসব আর্থিক অনিয়ম, এফডিআর জালিয়াতি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাপ্য অর্থ বুঝিয়ে না দেয়া, গ্রাহক হয়রানি ও অর্থ লোপাটের বিষয়ে আইডিআরএ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ বিষয়ে নর্দার্ণ ইসলামী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সিএফও স্বপন বলেন, আমাদের এসব বিষয়ে আইডিআরএকে ইতোমধ্যে জবাব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার কিছু জানার থাকলে আইডিআরএর কাছে জানতে পারেন।

এ বিষয়ে আইডিআরএ’র সদস্য (নন-লাইফ) মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কোম্পানিগুলো পলিসির বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে থাকে। অর্থাৎ, যে পরিমাণ প্রিমিয়াম আদায়যোগ্য তা যেন ব্যাংক গ্যারান্টির নির্ধারিত অর্থের সীমার মধ্যে থাকে। ব্যাংক গ্যারান্টি একটি আর্থিক নিশ্চয়তা। যদি কোনো ব্যাংক গ্যারান্টি না থাকে, পলিসির প্রিমিয়ামও পরিশোধ করা হয়নি, তাহলে ধরে নিতে হবে বাকী ব্যবসা। আর বাকী রেখে ব্যবসা পরিচালনা করা বীমা আইন লঙ্ঘন।

তিনি আরও বলেন, আমরা পলিসি গ্রাহক ও বীমাকারীর মধ্যে সৃষ্ট যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করতে পারি। এ ধরনের বিরোধ আমাদের দায়িত্বের আওতাভুক্ত। তবে বীমা কোম্পানি এবং কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তা সরাসরি আমাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। তারপরও মানবিক দিক বিবেচনা করে অভিযোগের প্রতিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়ে থাকি।

এ ছাড়া কোনো কোম্পানির উদ্যোক্তা মূলধনে ঘাটতি থাকলে সে বিষয়ে কোম্পানিকে শোকজ করা হয়। পাশাপাশি ঘাটতি পূরণ করে মূলধন বাড়ানোর জন্য সময় দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, আর্থিক বিনিয়োগের যে পোর্টফোলিও, সেখানে একটি নির্দিষ্ট ব্যালান্স তৈরি করতে হয়। এই ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকা মানে নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় আর্থিক বিনিয়োগ কম করা হয়েছে। অর্থাৎ, যে শতাংশ বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে, তার নিচে থাকলে বুঝতে হবে রিস্ক-ফ্রি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ কম হয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে রিস্কি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বেশি রয়েছে।

২০০৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নর্দার্ণ ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি এবং পরিশোধিত মূলধন ৪৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। কোম্পানির মোট ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৯২ হাজার ৫৯২টি শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৩০ দশমিক ৮২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৮ দশমিক ১৭ শতাংশএবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৪১ দশমিক ০১ শতাংশ। কোম্পানিটি বর্তমানে ‘এ’ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। সর্বশেষ ডিএসইতে শেয়ারটি ৩৫ টাকা ৮০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *