শনিবার, মে ৯, ২০২৬
এক্সক্লুসিভ

ব্যাংকে সংকট, ফুটপাথে পাহাড়সম নতুন টাকা—কারা জড়িত এই সিন্ডিকেটে ?

মোঃ আবদুল মান্নান প্রতিবেদক পুঁজিবাজার প্রেস.কমঃ বাংলাদেশে ঈদ এলেই মানুষের মধ্যে এক বিশেষ আবেগ কাজ করে। নতুন জামা, নতুন জুতা, নতুন আশা—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নতুন টাকার প্রতি একধরনের সাংস্কৃতিক আকর্ষণ। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ‘সালামি’ দেওয়ার জন্য নতুন নোটের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। শুধু ঈদ নয়, দুর্গাপূজা, বিবাহ অনুষ্ঠান, নববর্ষ, জাতীয় দিবস—সব ক্ষেত্রেই নতুন টাকার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। অথচ এই স্বাভাবিক ও বৈধ চাহিদাকে ঘিরেই বছরের পর বছর গড়ে উঠেছে এক সুসংগঠিত অবৈধ সিন্ডিকেট। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আশপাশে, গুলিস্তান ফুটপথে কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকের সামনে প্রকাশ্যে নতুন টাকার বান্ডিল বিক্রি হয়। পাঁচ টাকার নোট ছয় টাকায়, ১০ টাকার নোট ১২ টাকায়, ২০ টাকার নোট ২৫ টাকায়, ৫০ টাকার নোট ৬০ টাকায়, এমনকি ১০০ টাকার নোট ১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে—এই টাকা আসে কোথা থেকে? সাধারণ মানুষ ব্যাংকে গিয়ে যখন নতুন টাকা পায় না, তখন ফুটপথের দোকানদারদের কাছে হাজার হাজার টাকার নতুন নোট কীভাবে পৌঁছে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসে এক ভয়াবহ বাস্তবতা—বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এই ব্যবসা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে মুদ্রা ইস্যু ও নিয়ন্ত্রণের একমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নোট সরবরাহ, বিতরণ এবং ব্যবস্থাপনার পুরো দায়িত্ব তাদের। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানের নাকের ডগাতেই বছরের পর বছর প্রকাশ্যে চলছে নতুন টাকার কালোবাজার। প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ ব্যাংক কি বিষয়টি জানে না? নিশ্চয়ই জানে। কারণ, এটি কোনো গোপন ব্যবসা নয়। রীতিমতো প্রকাশ্য ফুটপথে, জনসমক্ষে, পুলিশের উপস্থিতিতেই এই বেচাকেনা হয়। ঈদের আগে সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবছর এই চিত্র উঠে আসে। তবুও কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? এর দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে। এক. কর্তৃপক্ষ চরমভাবে ব্যর্থ। দুই. ভেতরের কোনো অংশ এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। বাস্তবতা সম্ভবত দ্বিতীয়টির দিকেই বেশি ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর ঈদের আগে নতুন নোট ছাড়ে। বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে তা পৌঁছানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ব্যাংকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও মানুষ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ নতুন টাকা পায় না। অনেকে খালি হাতেই ফিরে আসে। অন্যদিকে ফুটপথে কোনো সংকট নেই। যত খুশি নতুন টাকা পাওয়া যায়। এর মানে কী? এর মানে হলো, অফিসিয়াল চ্যানেল থেকে টাকা বের হয়ে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ যাদের মাধ্যমে নতুন টাকা জনগণের হাতে পৌঁছানোর কথা, তারাই সেই টাকা কালোবাজারে পাচার করছে। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি সরাসরি জনগণের সম্পদের অপব্যবহার।

এই ব্যবসা পরিচালনার জন্য কয়েকটি ধাপ থাকে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতায় জানা যায়—বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন নোট বরাদ্দ, বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরবরাহ, ব্যাংকের ভেতরে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে আলাদা করে রাখা, দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে হস্তান্তর, ফুটপথ ও খুচরা বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি। এ ধরনের কাজ একজন সাধারণ ফুটপাত ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, নতুন নোটের উৎস নিয়ন্ত্রিত। এটি কোনো খোলা বাজারের পণ্য নয়। তাই ভেতরের যোগসাজশ ছাড়া এই ব্যবসা দাঁড়াতেই পারে না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই সিন্ডিকেট অনেক ক্ষেত্রে এতটাই শক্তিশালী যে, সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তারাও এর বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ঠেকানো, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের আস্থা রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব। অথচ সেই প্রতিষ্ঠান যদি নিজের ভেতরের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। একজন সাধারণ মানুষ যখন ব্যাংকে গিয়ে নতুন টাকা না পেয়ে পরে ফুটপথ থেকে অতিরিক্ত দামে সেই একই টাকা কিনতে বাধ্য হন, তখন তার মনে রাষ্ট্র সম্পর্কে কী ধারণা জন্মায়? তিনি ভাবেন—
“সবাই মিলে খাচ্ছে।” এই ধারণা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ভেঙে গেলে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।

অনেকে বলতে পারেন, “এ তো ছোটখাটো বিষয়!” কিন্তু বাস্তবে ছোট দুর্নীতিই বড় দুর্নীতির ভিত্তি তৈরি করে। যে সমাজে নতুন টাকার মতো একটি সাধারণ বিষয়েও সিন্ডিকেট তৈরি হয়, সেখানে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ, দুর্নীতির সংস্কৃতি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। আজ নতুন টাকা, কাল ঋণ কেলেঙ্কারি, পরশু রিজার্ভ চুরি। দুর্নীতির ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানসিকতা একই—রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত লাভের উপকরণ মনে করা। ঈদের সময় একজন বাবা তার সন্তানের জন্য নতুন টাকা চান। একজন মা আত্মীয়স্বজনকে সুন্দরভাবে সালামি দিতে চান। এটি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু সেই আবেগকেও ব্যবসায় পরিণত করেছে কিছু অসাধু চক্র। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মানুষ জানে এটি অবৈধ। তবুও বাধ্য হয়ে কিনে। কারণ বিকল্প নেই। এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে দুর্নীতিকে মানুষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে শুরু করে। আর এখানেই সমাজের নৈতিক পরাজয় ঘটে। বাংলাদেশে অনুমোদনহীনভাবে মুদ্রা বেচাকেনা আইনগতভাবে অপরাধ। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারও শাস্তিযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কখনো কি বড় কোনো অভিযান হয়েছে? কাউকে কি দৃশ্যমান শাস্তি দেওয়া হয়েছে? খুব কম। কারণ এই চক্রের শেকড় অনেক গভীরে। অনেক সময় দেখা যায়, ফুটপথের ছোট বিক্রেতাকে ধরে কয়েকদিন অভিযান চালানো হয়। কিন্তু মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে কিছুদিন পর আবার একই ব্যবসা শুরু হয়। সংবাদমাধ্যম প্রতিবছর নতুন টাকার কালোবাজার নিয়ে প্রতিবেদন করে।

টেলিভিশনে ভিডিও দেখানো হয়, পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। কেন? কারণ অনুসন্ধানগুলো অনেক সময় মূল জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। প্রকৃত তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম। আর সেখানেই শুরু হয় চাপ। তবুও গণমাধ্যমের দায়িত্ব থেমে থাকার নয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার। জনগণকে জানতে হবে—কারা তাদের অধিকার নিয়ে ব্যবসা করছে। বর্তমান যুগে ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেক উন্নত। কোন শাখায় কত নতুন টাকা গেল, কে নিল, কত বিতরণ হলো—সব তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ করা সম্ভব। তাহলে এই টাকার বড় অংশ কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে খুব সহজেই একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু করতে পারে—অনলাইন রেজিস্ট্রেশন, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক বরাদ্দ, নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, বিতরণের ভিডিও মনিটরিং। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তারা কি সত্যিই এটি বন্ধ করতে চায়? কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত একটি অংশ যখন লাভবান হয়, তখন তারা কখনোই স্বচ্ছতা চায় না। বাংলাদেশে অনেক সময় দেখা যায়, কোনো অনিয়ম দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সেটি “স্বাভাবিক” হয়ে যায়। নতুন টাকার কালোবাজারও তেমন একটি উদাহরণ। প্রশাসন যেন এটিকে অপরাধ হিসেবেই দেখতে চায় না। অথচ এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অপব্যবহার। যে দেশে ফুটপাথে প্রকাশ্যে নতুন টাকা বিক্রি হয়, সেখানে প্রশ্ন উঠবেই—রাষ্ট্র আসলে কার নিয়ন্ত্রণে? এই সমস্যা সমাধান অসম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং জবাবদিহি। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে—নতুন টাকা বিতরণের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করতে হবে। কোন শাখা থেকে কত টাকা বের হয়েছে, তার অডিট করতে হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা এবং ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ঈদের আগে নয়, সারা বছর মনিটরিং চালাতে হবে।

অনলাইন স্লট বুকিং চালু করলে দালালচক্র কমে যাবে। হটলাইন ও অনলাইন অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে। বাংলাদেশে দুর্নীতির বড় সমস্যা হলো—অনেক সময় ছোট ছোট অনিয়মকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু এই অনিয়মগুলোই পরে বড় সংকটে রূপ নেয়। নতুন টাকার কালোবাজার হয়তো হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি নয়। কিন্তু এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার প্রশ্ন। এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। যদি সরকার সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চায়, তাহলে এ ধরনের প্রকাশ্য অনিয়ম বন্ধ করেই শুরু করা উচিত। শুধু সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়ী করলেই হবে না। নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। আমরা যখন অতিরিক্ত দামে নতুন টাকা কিনি, তখন অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও এই অবৈধ ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখি। সামাজিকভাবে এই প্রবণতার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে হবে। নতুন টাকার প্রতি মানুষের ভালোবাসা অপরাধ নয়। অপরাধ হলো সেই আবেগকে পুঁজি করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে বসে অবৈধ ব্যবসা করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে আজ বড় প্রশ্ন—তারা কি সত্যিই জনগণের প্রতিষ্ঠান, নাকি কিছু অসাধু চক্রের নিয়ন্ত্রিত একটি দুর্বল কাঠামো? ফুটপাথে নতুন টাকার অবৈধ বাজার শুধু কয়েকজন দালালের ব্যবসা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির একটি আয়না। সেই আয়নায় জনগণ আজ যা দেখছে, তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। অতএব, সময় এসেছে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার। নতুন টাকার কালোবাজার বন্ধ করতে হবে। জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনতে হবে। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ, একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার রিজার্ভে নয়, তার প্রতিষ্ঠানের সততা ও জবাবদিহিতার মধ্যেও নিহিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *