বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
আজকের সংবাদ

কমোডিটি ডেরিভেটিভস বাজারে ৭ ব্রোকারের লাইসেন্স, শুরুতে গোল্ড-সিলভার

দেশে কমোডিটি ডেরিভেটিভস বাজার চালুর প্রস্তুতি আরও জোরদার করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বাজার চালুর প্রথম ধাপ হিসেবে কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকার তৈরির প্রক্রিয়ায় গতি আনা হয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সদস্যভুক্ত সাতটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে।

নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করলে প্রথম ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানকে কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকারের লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা করছে কমিশন। বিএসইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ, বি-রিচ, সোহেল সিকিউরিটিজ, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ, রয়েল ক্যাপিটাল, ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ ও ন্যাশনাল লাইফ সিকিউরিটিজ।

এ ছাড়া আরও কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান আবেদন করতে পারে বলে জানা গেছে। এ তালিকায় পিএসপি স্টক অ্যান্ড সিকিউরিটিজ, ওয়ান লিমিটেড এবং রেমনস ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, কমোডিটি ডেরিভেটিভস বাজার চালুর প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণকারী সাতটি ব্রোকারকে লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি জানান, বাজারের কার্যক্রম শুরুতে গোল্ড ও সিলভার নিয়ে ক্যাশ সেটেলমেন্ট কন্ট্রাক্ট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হলে ফিজিক্যাল ডেলিভারির ব্যবস্থাও চালু করা হবে।

প্রথম পর্যায়ে গোল্ড ও সিলভার দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও ভবিষ্যতে কপার, কটন এবং ক্রুড পাম অয়েলের মতো পণ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুতে কোনো পণ্যের সরাসরি সরবরাহ বা ফিজিক্যাল ডেলিভারি থাকবে না। চুক্তির মেয়াদ শেষে সংশ্লিষ্ট পণ্যের দামের পার্থক্য নগদ অর্থে নিষ্পত্তি করা হবে।

পরবর্তী ধাপে পণ্য সরবরাহের সুযোগ চালু করতে অনুমোদিত ওয়্যারহাউজ, পণ্যের মান ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য অ্যাসেয়িং ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

কমোডিটি ডেরিভেটিভস বাজারকে শুধু জল্পনাভিত্তিক লেনদেনের জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় না বিএসইসি। বরং পণ্যের দামের ওঠানামা থেকে ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর জন্য এটিকে একটি কার্যকর হেজিং মার্কেট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় কমিশন।

আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, বড় কমোডিটি ব্যবসায়ী, উৎপাদনকারী এবং রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ বাজারে হেজার হিসেবে অংশ নিতে পারবে। ভবিষ্যতে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে বা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি আগাম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা লোকসানের আশঙ্কা কমাতে পারবেন।

অর্থাৎ এই বাজারের প্রধান উদ্দেশ্য সরাসরি বেশি মুনাফা করা নয়; বরং ভবিষ্যতে পণ্যের মূল্য পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা। হেজারদের এ সুবিধা দিতে তুলনামূলক বেশি পজিশন লিমিট দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

দেশে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০০৭ সালে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালে এ উদ্যোগ চূড়ান্ত নিবন্ধন পায়। ভারতের মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ এবং পাকিস্তান মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সিএসই।

বাজার চালুর প্রস্তুতি হিসেবে আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচিং, অর্ডার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ইতোমধ্যে স্থাপন করেছে সিএসই। শ্রীলঙ্কাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তায় মূল ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতীয় একটি সরবরাহকারীর ডেরিভেটিভস সফটওয়্যারও যুক্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে প্রায় ২০০ ট্রেডারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রস্তুত করা হয়েছে ১৫টি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান। কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠায় প্রায় ১২০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

বাজার চালুর আগে ব্রোকারদের লাইসেন্স দেওয়া, লেনদেনের অবকাঠামো প্রস্তুত করা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং ওয়্যারহাউজ ও অ্যাসেয়িং সুবিধা গড়ে তোলাই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও এক্সচেঞ্জের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব প্রস্তুতি শেষ হলে দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতে পণ্যের মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন একটি কার্যকর বাজার তৈরি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *