সোমবার, আগস্ট ২৪, ২০২৬
আজকের সংবাদ

ডমিনেজ স্টিলের ৩০ শতাংশ শেয়ার বিক্রিতে শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন বিএসইসির

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের প্রতিষ্ঠান ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের প্রায় ৩০ শতাংশ শেয়ার নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাবে শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

সর্বশেষ কমিশন সভায় কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে থাকা ৩ কোটি ৭ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার আকিজ রিসোর্সেস লিমিটেড, শেখ জসিম উদ্দিন ও ফারিয়া হোসেনের কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট শর্তগুলো তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

প্রস্তাবিত শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হলে নতুন বিনিয়োগকারীদের হাতে ডমিনেজ স্টিলের প্রায় ৩০ শতাংশ মালিকানা চলে যাবে। বিএসইসির নির্ধারিত শর্ত মেনে কেন্দ্রীয় ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের বিধিমালার আওতায় সমঝোতার ভিত্তিতে বাজারের বাইরে মিলযুক্ত লেনদেনের মাধ্যমে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হবে।

গত ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন করে ডমিনেজ স্টিল। এরপর শেয়ার হস্তান্তরের অনুমতি চেয়ে বিএসইসির কাছে আবেদন করে কোম্পানিটি।

শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদনের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি শর্ত আরোপ করেছে বিএসইসি। শর্ত অনুযায়ী, কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক উদ্যোক্তা-পরিচালকের ব্যক্তিগতভাবে কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে।

এ ছাড়া হস্তান্তরের জন্য নির্ধারিত শেয়ার কোনো ঋণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে বন্ধক বা জামানত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

বিএসইসির অনুমোদনের ছয় মাসের মধ্যে কোম্পানিকে সব অনিষ্পন্ন বিষয় নিয়মিত বা নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে কমিশনের অনুমোদনের তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রস্তাবিত শেয়ার হস্তান্তরের কাজ শেষ করতে হবে।

এই শর্তগুলো আরোপ করেই উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে থাকা ৩ কোটি ৭ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার আকিজ রিসোর্সেস লিমিটেড, শেখ জসিম উদ্দিন ও ফারিয়া হোসেনের কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ডমিনেজ স্টিলের শেয়ার ধারণের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির ৫৪ দশমিক ১৮ শতাংশ শেয়ার ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে শূন্য দশমিক শূন্য ২ শতাংশ শেয়ার।

এই তিন শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের হাতে মোট ৬৯ দশমিক ৮০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বাকি ৩০ দশমিক ২০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৭ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার ছিল উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে।

ফলে প্রস্তাবিত শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হলে কোম্পানিটির মালিকানা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে থাকা প্রায় পুরো অংশ নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনাতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও পরিচালনাগত দুর্বলতায় থাকা ডমিনেজ স্টিলের জন্য সম্ভাব্য মালিকানা পরিবর্তনকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

আকিজ গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান আকিজ রিসোর্সেসের ইস্পাত খাতে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা রয়েছে। নতুন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের ফলে ডমিনেজ স্টিলে নতুন মূলধন আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থাপনা উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিতে পারে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন মূলধন কোম্পানিটির আর্থিক চাপ কমাতে এবং চলতি মূলধনের সংকট কাটাতে সহায়তা করতে পারে। ইস্পাত ও প্রকৌশল খাতে আকিজ রিসোর্সেসের অভিজ্ঞতা ডমিনেজ স্টিলের পরিচালন সক্ষমতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এর আগে আকিজ রিসোর্সেসের উপপ্রধান আর্থিক কর্মকর্তা রায়হান কবির জানিয়েছিলেন, সম্ভাব্য এই অধিগ্রহণকে ইতিবাচকভাবেই দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সে সময় আর্থিক ও আইনগত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই চলছিল বলে তিনি জানান।

ডমিনেজ স্টিলের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি দুর্বল রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে কোম্পানিটির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।

এ সময়ে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ৯৪ লাখ টাকা। ফলে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৯ পয়সা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোম্পানিটির উৎপাদন ও পরিচালন কার্যক্রমও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিদর্শনে নরসিংদীতে ডমিনেজ স্টিলের কারখানা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে কোম্পানিটির দাবি ছিল, সাভারে তাদের একটি ইউনিট তখনও চালু ছিল।

কোম্পানিটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৌশল ও নির্মাণভিত্তিক ব্যবসা হওয়ায় সব কারখানায় সব সময় ধারাবাহিক উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তাদের ব্যবসার বড় অংশ প্রকল্পভিত্তিক এবং উল্লেখযোগ্য কাজ সরাসরি নির্মাণস্থলেই সম্পন্ন করা হয়।

দুর্বল আর্থিক অবস্থার মধ্যেও সম্ভাব্য মালিকানা পরিবর্তনের গুঞ্জনে চলতি বছরের মার্চ থেকে ডমিনেজ স্টিলের শেয়ারদর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সর্বশেষ লেনদেন পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রায় ১৪৭ শতাংশ বেড়ে ৬১ টাকা ৭০ পয়সায় পৌঁছেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, মালিকানা পরিবর্তন, নতুন বিনিয়োগ এবং ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করেই শেয়ারটির দাম দ্রুত বেড়েছে।

তবে কোম্পানিটির দুর্বল আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে শুধু সম্ভাব্য অধিগ্রহণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত না নিতে সতর্ক করছেন তারা। ২০২০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ডমিনেজ স্টিল ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

বিএসইসির শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনের ফলে ডমিনেজ স্টিলের মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। তবে শেয়ার হস্তান্তর শেষ হওয়ার পর নতুন বিনিয়োগকারীরা কতটা কার্যকরভাবে কোম্পানিটির ব্যবসা ও উৎপাদন কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

পর্যাপ্ত নতুন মূলধন বিনিয়োগ, উৎপাদন ও প্রকল্প কার্যক্রম সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা গেলে দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে ডমিনেজ স্টিল।

তবে শুধু মালিকানা পরিবর্তনই কোম্পানিটির টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করবে না। নতুন ব্যবস্থাপনার বাস্তব পদক্ষেপ, মূলধন বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপরই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে ডমিনেজ স্টিল কতটা সফলভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *