বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৬
এক্সক্লুসিভ

পুঁজিবাজারে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না করে বরং তুলনামূলক নিরাপদ ও বেশি রিটার্নমুখী খাতে অর্থ স্থানান্তর করছে আইসিবি

পুঁজিবাজার উন্নয়ন, বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, সঞ্চয় সংগ্রহ এবং এ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে গঠিত হয় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে কাজ করে আসছে রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পুঁজিবাজারে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না করে বরং তুলনামূলক নিরাপদ ও বেশি রিটার্নমুখী খাতে অর্থ স্থানান্তর করছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে করে শেয়ারবাজারে যেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তেমনি প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্যবিচ্যুতিও স্পষ্ট হচ্ছে।

শেয়ারবাজারে কমছে বিনিয়োগ, বাড়ছে অন্য খাতে

২০২৩-২৪ অর্থবছরে আইসিবির মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ রয়েছে ১২ হাজার ৯১৩ কোটি টাকার। অন্যদিকে মাত্র এক বছরে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ৪৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩০৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের আশায় ট্রেজারি বন্ডে এমন ঝুঁকে পড়া মনোভাব পুঁজিবাজারের জন্য কল্যাণকর নয়। যেখানে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত বিনিয়োগ করার কথা ছিল আইসিবির, সেখানে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত নিরাপদ খাতে মুনাফা খোঁজার প্রবণতা দেখাচ্ছে।

মিউচুয়াল ফান্ড থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার

পুঁজিবাজারের ভিত্তি মিউচুয়াল ফান্ড। তারল্য সংকট মোকাবিলায় আইসিবি এখন মিউচুয়াল ফান্ড থেকেও বিনিয়োগ প্রত্যাহার করছে। সম্প্রতি বে-মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ।

আবু আহমেদ বলেন, আইসিবি থেকে টাকা নিয়ে নিজেরা ভালো করতে পারেনি, আবার আইসিবিকে ডিভিডেন্টও দিতে পারেনি। এই মূহূর্তে বেশ কয়েকটা মিউচুয়্যাল ফান্ড আছে। এখন ওগুলো থেকে টাকা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটা এজন্য হয়েছে যে, আইসিবি নিজে আরও ভালো অবস্থায় ম্যানেজ করতে পারে, সেখানে অন্যকে টাকা দিয়ে বছরের পর বছর ডিভিডেন্ট না পাওয়া, এই অবস্থায় চলতে পারে না। সবার থেকে যে নেওয়া হচ্ছে তা না, যেগুলো খুব খারাপ রেজাল্ট দিচ্ছে তাদের থেকে নেওয়া হচ্ছে।

ঋণের দায়ে জর্জরিত আইসিবি

অত্যধিক ঋণের চাপও পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারের কাছ থেকে ৮১৭ কোটি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংক থেকে ৩ হাজার ২৭ কোটি এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমানত হিসেবে আরও ৭ হাজার ২৭ কোটি টাকা নিয়েছে আইসিবি। এসব তহবিলের বিপরীতে শুধু সুদ বাবদ ৯ মাসে খরচ হয়েছে ৬৯৯ কোটি টাকা। যেখানে এর বিপরীতে এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির সুদ বাবদ আয় হয়েছে ১২৫ কোটি টাকা।

অর্থাৎ নেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে কয়েক শত কোটি টাকায়, যা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। ঋণের ভারে প্রতিষ্ঠানটির ভোগান্তি উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবু আহমেদের ব্যক্তব্যেও। তিনি বলেন, বিগত ১০ দশ বছরে আইসিবি অনেক পিছিয়ে গেছে। আইসিবির এখনও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ঋণের বোঝা। যেটার বিপরীতে প্রতি বছরে ৯৬০ কোটি টাকা সুদ দিতে হয়। সুদ দিতে না পারলে সেটা আবার ঋণে রূপান্তর হয়। ফলে দিনের পর দিন আইসিবির শুধু দেনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

খেলাপি ঋণ ও অনিশ্চিত আমানতের বোঝা

পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। গত ৩১ মার্চ শেষে আইসিবির মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ৭৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এসব অর্থের বড় একটি অংশ আটকে আছে বিতর্কিত ও দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে।

আইসিবি সূত্রে জানা যায়, পদ্মা ব্যাংকে আইসিবির আমানত ১৫৪ কোটি ও ইকুইটি বিনিয়োগ ৮৫ কোটি টাকা। পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে ২৫ কোটি, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সে ৪৭ কোটি, এফএএস ফাইন্যান্সে ৫৬ কোটি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ৪৭ কোটি, ফার্স্ট ফাইন্যান্সে ১৬১ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে ১৯১ কোটি ও ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ১৩৪ কোটি টাকার আমানত রয়েছে আইসিবির। এসব বিনিয়োগের অধিকাংশগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছে আইসিবি

প্রতিষ্ঠার সময়ে আইসিবি’র যে মূল উদ্দেশ্য ঠিক করা হয় তা হলো পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ। কিন্তু বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইসিবি এমন খাতে বিনিয়োগ করছে যা প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে পুঁজিবাজারেও রয়েছে তারল্য সংকট। এই সংকটপূর্ণ অবস্থায় পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট মোকাবেলায় আইসিবি ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু আইসিবি’র চমচলমান প্রবণতায় পুঁজিবাজার যেমন কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না, তেমনি প্রতিষ্ঠানটিও তাঁর মূল কাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
আইসিবি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান বলেন, পিছিয়ে গেছে অলরেডি। বিগত ১০ দশ বছরে আইসিবি অনেক পিছিয়ে গেছে। আইসিবি এক ধরণের লুন্ঠিত হয়েছে এটা হলো কথা। তখন আইসিবি বিভিন্ন ফান্ড থেকে উচ্চ সুদে বড় করেছে। এখন সেগুলোই হয়ে গেছে আইসিবির গলার কাঁটা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তব্য

ডিএসই’র পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, আইসিবি গত দশ বছরে বাজারে কোন ভূমিকা রাখে নাই। এই দুঃশাসনের সময়ে আইসিবিকে একটা ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত করা হয়েছে। বাজারকে আইসিবির বাইরে অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

মিউচুয়্যাল ফান্ড থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা মনে করি আইসিবির যে পরিমাণ লসের শেয়ার আছে সেগুলো থেকে খুব বেশি পরিমাণ বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুযোগ নাই। এটাতে সাময়ীক প্রভাব পড়তে পারে কিন্ত দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নাই।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) এর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, আইসিবি মূলত প্রাথমিকভাবে ক্লোজ এন্ড ফান্ডে বিনিয়োগ করে। ওপেন এন্ড ফান্ডে তো মাত্র বিনিয়োগ শুরু করেছে। সেখানে বাজারে প্রভাব পড়ার মতো অনেক বেশি পরিমাণে বিনিয়োগ বের করে আনতে পারবে বলে মনে হয় না। কারন বাজারে প্রভাব পড়ার মতো বিনিয়োগ তাদের নাই।

পুঁজিবাজারের পরিবর্তে নিরাপদ ও রিটার্নমুখী খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে বলেন, এটা করলে তো আর আটকানো যাবে না। আইসিবির যেহেতু নিজস্ব অবস্থা খারাপ, যেখান থেকে রিটার্ন পাবে সেখানেই বিনিয়োগ করবে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইসিবির বর্তমান অবস্থা মূলত নীতিগত বিচ্যুতি, ভুল বিনিয়োগ এবং কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। এক সময়ের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি এখন শুধু তারল্য সংকটেই নয়, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তাই সরকারের উচিত আইসিবির কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করা এবং প্রতিষ্ঠানটিকে তার মূল ভূমিকায় ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *