রানার অটোমোবাইলসের অস্বাভাবিক সেলস বৃদ্ধি, নাকি দুরভিসন্ধি
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি রানার অটোমোবাইলস পিএলসি স্মরণকালের ভয়াবহ ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটি বিক্রির (সেলস) পরিমাণ বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ, যা অতিতে কোনো সময়ই এতো বেশি সেলস বাড়েনি কোম্পানিটির। এমন আকস্মিক সেলস বৃদ্ধিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, সম্প্রতি চাইনিজ ইয়াদিয়া ব্র্যান্ডের ইলেকট্রিক স্কুটার বাংলাদেশে বাজারজাত শুরু করেছে রানার অটোমোবাইলস। চাইনিজ কোম্পানিটি ও গ্রাহকদের কাছে নিজেদের পারফর্মেন্স ভালো দেখানোর উদ্দেশ্যেই মূলত সেলসের পরিমাণ বেশি দেখিয়েছে রানার অটোমোবাইলস। রানারের মটরসাইকেল বাজারে প্রায় নেই বললেই চলে। কোনো গ্রাহক একবার রানারের প্রডাক্ট (পণ্য) কিনলে দ্বিতীয়বার আর কিনতে চায় না। অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় রানারের মটরসাইকেলে তেল অনেক বেশি লাগে। যন্ত্রপাতিও নিম্নমানের। খুব অল্প সময়েই নষ্ট হয়ে যায় প্রডাক্ট। কোম্পানিটির ব্যবসা এতোই খারাপ যে, গত দুই বছর কোম্পানিটি লোকসান করেছে। ২০২৩ সালে কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি বিনিয়োগকারীদের। সেই কোম্পানির হঠাৎ করেই এই সেলস বৃদ্ধিকে পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছু নয়।
জানা গেছে, মুনাফা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ২০২৩ সালে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বাজাজের সহযোগিতায় দেশে এলপিজি ও সিএনজিচালিত তিন চাকার অটোরিকশা তৈরি ও বাজারজাত শুরু করে রানার অটোমোবাইলস। বছরে ৩০ হাজার থ্রি-হুইলার অটোরিকশা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। কোম্পানিটির আশা ছিল মুনাফা বাড়বে। কিন্তু মুনাফাতো বাড়েইনি, উপরুন্ত পর পর দুই বছর লোকসান করেছে কোম্পানিটি। এতে করে রানারের পাশাপাশি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বাজাজকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখছে গ্রাহকরা। এতো কিছু জানার পরেও এরকম একটি নিম্নমানে কোম্পানির সাথে ইন্টারন্যাশলাল ব্র্যান্ড ইয়াদিয়া কেন যুক্ত হলো তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সবার মনে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, ইয়াদিয়া ও রানার অটোমোবাইলস কি ব্যবসার আড়ালে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে টাকা পাচারের উদ্দেশ্যে যৌথভাবে ব্যবসায় নেমেছেন। নাকি আরও অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। তা অবশ্য সময়েই বলে দেবে।
এদিকে ইয়াদিয়ার সাথে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের শুরুতেই ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে রানার। প্রতিষ্ঠানটির সাথে ব্যবসা শুরুর চুক্তিটি মূল্য সংবেদনশীল আকারে (পিএসআই) স্টক এক্সচেঞ্জ ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) জানায়নি রানার অটোমোবাইলস। কেন জানায়নি তা নিয়ে অবশ্য ইতিমধ্যে তদন্তে নেমেছে বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জ।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০১৯-২০ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২০) রানার অটোমোবাইলসের সেলস হয়েছিল ৮১ কোটি ১৪ লাখ ২৫ হাজার ২০৬ টাকা, ২০২০-২১ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২১) সেলস হয়েছিল ৯৬ কোটি ৩৮ লাখ ২৭ হাজার ৩৪৩ টাকা, ২০২১-২২ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২২) সেলস হয়েছিল ৯৩ কোটি ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৪ টাকা, ২০২২-২৩ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২৩) সেলস হয়েছিল ৭২ কোটি ২৭ লাখ ৬৭ হাজার ৩৫৯ টাকা, ২০২৩-২৪ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২৪) সেলস হয়েছিল ৭০ কোটি ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৭ টাকা এবং ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ,২৫) সেলস হয়েছে ১৬৬ কোটি ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৯৬ টাকা।
গত এক বছরের ব্যবধানে হঠাৎ করেই সেলসে পরিমাণ বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় সেলস ৯৫ কোটি ৮৬ লাখ ৭১ হাজার ২১৯ টাকা বা ১৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয় বেড়েছে মাত্র ৪ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ১৫৩ টাকা।
ফলে বিনিযোগকারীদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, রানার অটোমোবাইলসের চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে আদৌ কি ১৩৬ শতাংশ সেলস বেড়েছে। নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সঠিক তথ্য গোপন করেছে।
ইয়াদিয়া ব্র্যান্ডের মার্কেটিংয়ের হেড মাহমুদুর রহমান মামুন ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, রানারের যে ফ্যাসিলিটি রয়েছে তা অন্য কোনো কোম্পানির নেই। যেকারণে আমরা রানারের সাথে যুক্ত হয়েছি। আমরা ভালো কিছুই করবো।
তিনি বলেন, রানারের মটরসাইকেলের বাজারজাতকরণের নেতিবাচক প্রভাব ইয়াদিয়ার ওপরে পড়বে না। আর ইয়াদিয়ার সাথে চুক্তির বিষয়টি কেন গোপন করেছে রানার সেব্যাপারে আমি কিছু বলতে পাড়বো না। এটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার।
এদিকে এসব ব্যাপারে জানতে রানারের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) সনাৎ দত্ত ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, রানারের থ্রি-হুইলার অটোরিকশা বিক্রির কারণে রেভিনিউ বা সেলসের পরিমাণ বেড়েছে। তিনি বলেন, এই থ্রি-হুইলার বিক্রিতে আমাদের কষ্ট অনেক কম হয়েছে।
এনিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা জানান, ২০২৩ সালে রানার থ্রি-হুইলার অটোরিকশা বাজারজাত শুরু করে। সেই বছর রানার লোকসান করে। এমনকি ২০২৪ সালেও রানার লোকসান করে। গত দুই বছর সেলস বৃদ্ধিতে থ্রি-হুইলার অটোরিকশা কোনো অবদান রাখতে পারেনি। তাহলে কিসের ম্যাজিকে থ্রি-হুইলার বিক্রির কারণে সেলসের পরিমাণ এতো বেড়েছে।
তারা আরও বলেন, দেশের মানুষ রানারের প্রডাক্টের নাম শুনতেই পারে না। এছাড়া দেশিও বাজারে এর কোন চাহিদাও নেই। এতো অল্প সময়ের ব্যবধানে রানার বিক্রির পরিমাণ এতো বেশি দেখিয়েছে যে, তা যুক্তিযুক্ত নয়। এখানে নিশ্চয় কোম্পানিটির কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আমি বরাবরিই বলে আসছি রানার যেভাবে আওয়াজ তুলে বাজারে এসেছে সেটি তারা ধরে রাখতে পারেনি। রানারের পণ্যের চাহিদা গ্রাহকদের কাছে অনেক কম। দেশি কোম্পানি হিসেবে কোম্পানিটি নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। অথচ মেলে ধরার অনেক সুযোগ ছিল। ম্যানেজমেন্টের অস্বচ্ছতা, উদাসিনতা, দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণে কোম্পানিটির আজ বেহাল দশা।
রানার অটোমোবাইলসের তথ্য গোপন, অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র ধাবাবাহিকভাবে কয়েকটি পর্ব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আকারে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমে তুলে ধরা হবে। আজ তুলে ধরা হলো তৃতীয় পর্ব।
