শেয়ারবাজারে বিদেশিদের বিক্রির চাপ, আগস্টে ২১৮ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি
ঢাকার শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির প্রবণতা বেড়েছে। চলতি আগস্টের ২৭ তারিখ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মোট ২৮১ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে ৬৩ কোটি টাকার শেয়ার কিনলেও বিক্রি করেছেন ২১৮ কোটি টাকার। অর্থাৎ কেনার তুলনায় ১৫৫ কোটি টাকা বেশি মূল্যের শেয়ার বিক্রি করেছেন তাঁরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। আলোচ্য সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ডিএসইর মোট লেনদেনের মাত্র শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ১ হাজার ১৪৭ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। বিপরীতে বিক্রি করেছেন ১ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার শেয়ার। অন্যদিকে ব্রোকার-ডিলার হিসাবের মাধ্যমে প্রায় ২৭৫ কোটি টাকার শেয়ার কেনা হয়েছে এবং বিক্রি হয়েছে ২৫৯ কোটি টাকার।
এ সময়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ১৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেছেন ১৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার। ডিএসইর মোট লেনদেনের ৮৯ দশমিক ১২ শতাংশই হয়েছে এই শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নতুন করে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ শুরু করেছিল। তবে সেই প্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বর্তমানে বিদেশিদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
তাঁদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন এখন মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে কেন্দ্রীভূত। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, গ্রামীণফোন ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।
তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি বাংলাদেশের শেয়ারবাজার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন-এমনটা মনে করছেন না সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য, কিছু শেয়ার বিক্রি করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির শেয়ার কিনছেন বিদেশিরা। মূলত তহবিলের মেয়াদ, বিনিয়োগ কৌশল এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তাঁরা শেয়ার কেনাবেচার সিদ্ধান্ত নেন।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই শেষে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মোট শেয়ারের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৪৭১ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল ১৯০ কোটি ৭৪ লাখ শেয়ার। অর্থাৎ মোট শেয়ারের মধ্যে বিদেশিদের মালিকানা ছিল ২ দশমিক ০১ শতাংশ।
এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই শেষে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মোট শেয়ার ছিল ৯ হাজার ১৭৪ কোটি ৯৩ লাখ। তখন বিদেশিদের হাতে ছিল ১৮৯ কোটি ৬৮ লাখ শেয়ার, যা মোট শেয়ারের ২ দশমিক ০৭ শতাংশ।
অর্থাৎ এক বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ারের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও মোট শেয়ারের তুলনায় তাঁদের মালিকানার অংশ কমেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশীদারত্ব কমেছে ডিএসইর বাজার মূলধনেও। ২০২৫ সালের জুলাই শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মোট বাজার মূলধন ছিল প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
চলতি বছরের জুলাই শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ালেও বিদেশিদের অংশ কমে হয়েছে ৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে শুধু শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক উত্থান-পতন নয়, বরং বাজারের কাঠামোগত উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। সুশাসন নিশ্চিত করা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো সংস্কার এবং ভালো মৌলভিত্তির নতুন কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
এর পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং বাজারের ওপর আস্থাও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
