শনিবার, অক্টোবর ৩, ২০২৬
আজকের সংবাদ

‘ডিএসইর ২২ ব্রোকারেজ হাউসে বন্ধ লেনদেন’

অনিয়ম, দুর্নীতি এবং তদারকির ঘাটতির কারণে দেশের পুঁজিবাজারে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সমন্বিত গ্রাহক হিসাব, প্রকৃত সম্পদ এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার সংরক্ষণে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ২২টি ট্রেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানের লেনদেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের হাজারো বিনিয়োগকারী নিজেদের অর্থ ও শেয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বন্ধ থাকা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, বাংকো সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ ও মশিউর সিকিউরিটিজ অন্যতম। এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও সম্পদে বড় ধরনের ঘাটতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজে ১২৬ কোটি টাকা, বাংকো সিকিউরিটিজে ১২৮ কোটি টাকা, তামহা সিকিউরিটিজে ১৪০ কোটি টাকা এবং মশিউর সিকিউরিটিজে ১৬১ কোটি টাকার ঘাটতি পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে আরও যেসব ট্রেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানের লেনদেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে, সেগুলো হলো বেক্সিমকো সিকিউরিটিজ, সিনহা সিকিউরিটিজ, পিএফআই সিকিউরিটিজ, সালতা ক্যাপিটাল, অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ডন সিকিউরিটিজ, ইনডিকেট সিকিউরিটিজ, আল ফয়সাল সিকিউরিটিজ, শাহ মুহাম্মদ সগির অ্যান্ড কোম্পানি, ট্রেডক্যাপ স্টক ব্রোকারেজ, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ড, কবির সিকিউরিটিজ, মনার্ক হোল্ডিংস, স্নিগ্ধা ইকুইটিজ, সোনালি সিকিউরিটিজ, ট্রেড এক্স সিকিউরিটিজ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ এবং সামিন সিকিউরিটিজ।

এখানে উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনে অসঙ্গতি রয়েছে। শুরুতে ২২টি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হলেও চারটি প্রতিষ্ঠানের নামের পর আরও ১৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২২টিই। ফলে ‘আরও ১৭টি’ উল্লেখ থাকলে তা সংশোধনযোগ্য।

 

এদিকে এনআরবিসি সিকিউরিটিজে সম্প্রতি ৫২ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত করেছে ডিএসই। তবে প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন এখনো চালু রয়েছে।

 

ডিএসইর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আসাদুর রহমান বলেন, অনেক ট্রেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা যাচ্ছে না। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধও রয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। দু-একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে।

২০২০ সালের ২৪ জুন প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যায় ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মালিকপক্ষ। পরে অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১২৬ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত করে ডিএসই। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল্লাহ এবং তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান।

 

 

২০২১ সালের ৭ জুন বাংকো সিকিউরিটিজে ১২৮ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৫ জুন প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন বন্ধ করে দেয় ডিএসই। একই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুল মুহিতকে বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনিও জামিনে মুক্তি পান।

এরপর ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর তামহা সিকিউরিটিজে ১৪০ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালের আগস্টে মশিউর সিকিউরিটিজে ১৬১ কোটি টাকার ঘাটতি পাওয়া যায়। মশিউর সিকিউরিটিজের লেনদেন ২৮ অক্টোবর থেকে স্থগিত করে ডিএসই।

ডিএসই কর্মকর্তারা জানান, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমন্বিত গ্রাহক হিসাব থেকে বিনিয়োগকারীদের জমা করা অর্থ আইনবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের কারণেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন বন্ধ করা হয়েছে।

 

 

মশিউর সিকিউরিটিজের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, বেতনের অর্থ থেকে তিনি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। ২০২৪ সালে জানতে পারেন, তাঁর ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। এরপর থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য যোগাযোগ করলেও এখনো টাকা ফেরত পাননি।

মশিউর সিকিউরিটিজের পরিচালক শেখ মোগল জান রহমান বলেন, গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কুয়াকাটায় থাকা প্রতিষ্ঠানের একটি আবাসিক হোটেল বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি মাওনায় থাকা কিছু সম্পদও বিক্রি করা হচ্ছে। এসব সম্পদ ও অন্যান্য তহবিল থেকে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের জন্য চেক দেওয়ার আশা করছেন তারা।

 

 

ডিএসইর সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদ ইকবাল হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যেসব ট্রেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানের লেনদেন বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। এ জন্য ফরেনসিক অডিট করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদ জব্দ করে তা বিক্রির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ডিএসইর সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, এ ধরনের সংকট নিরসনে ডিএসইকে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। অতীতে সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নজির রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন।

 

 

জানা গেছে, বিশেষ অডিটর প্যানেল গঠন করে আগাম ঘোষণা ছাড়াই যেকোনো ব্রোকারেজ হাউস পরিদর্শনে পাঠাতে ডিএসইকে নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি। পাশাপাশি কমিশন নিজেও এসব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করবে। গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে যেসব ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার তছরুপের ঘটনা ঘটেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, যেসব ব্রোকারেজ হাউস থেকে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে, সেসব বিনিয়োগকারীকে দ্রুত বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি, মালিকদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *