সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
আজকের সংবাদ

আইপিও-আরপিওর অর্থ ব্যবহারে কঠোর বিধির প্রস্তাব বিএসইসির

পুঁজিবাজার প্রেস প্রতিবেদক: শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও পুনঃপ্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আরপিও) মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

প্রস্তাবিত বিধিমালায় ঋণ পরিশোধ, যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ, সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন ও ব্যবসা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থ ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণের পাশাপাশি আর্থিক তথ্য যাচাই এবং নিরীক্ষিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

রোববার ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫’-এর সংশোধিত খসড়া জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করেছে বিএসইসি। খসড়াটির বিষয়ে মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি জানানোর শেষ সময় আগামী ২ নভেম্বর। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম।

প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, পাবলিক অফারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ পরিশোধে এবং ৭০ শতাংশ যৌথ উদ্যোগ, সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা অধিগ্রহণে ব্যয় করা যাবে। অর্থ ব্যবহারের জন্য তফসিলি ব্যাংকে পৃথক এসক্রো হিসাব খোলার বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রস্তাবও করা হয়েছে। প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা উদ্দেশ্য ছাড়া ওই হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে খসড়ায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অর্থ নির্দিষ্ট প্রকল্প বা ব্যবসার ভারসাম্য রক্ষা, আধুনিকীকরণ, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণের (বিএমআরই) কাজে ব্যয় করা হয়ে থাকতে হবে। ঋণের অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিরীক্ষকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য ঋণ খেলাপি কিংবা পুনঃতফসিলকৃত হওয়া যাবে না। শর্ত পূরণের প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অথবা প্রধান নির্বাহীর স্বাক্ষরযুক্ত প্রত্যয়নপত্র বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে হবে।

যৌথ উদ্যোগ গঠন, সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ধরন ও সম্ভাব্য সুবিধা প্রসপেক্টাসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। পাবলিক অফারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের সম্পূর্ণ ব্যবহার শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিএসইসির প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষকের মাধ্যমে নিরীক্ষিত প্রতিবেদন কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়ার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আইপিও আবেদনের আগেই আর্থিক তথ্য যাচাই

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইপিওর আবেদন জমা দেওয়ার আগেই বিএসইসির প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষকের মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। এ যাচাইয়ের আওতায় কোম্পানির আয়, পাওনা, মজুতপণ্য, ঋণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন, করসংক্রান্ত বিষয়, আইনি ঝুঁকি ও জালিয়াতির আশঙ্কাসহ বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করতে হবে। যাচাই প্রতিবেদন প্রসপেক্টাসের সঙ্গে সংযুক্ত করার পাশাপাশি আবেদনপত্রের সঙ্গেও জমা দিতে হবে।

এ ছাড়া কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক বছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন এবং আইপিও আবেদনের সময় পুঞ্জীভূত লোকসান না থাকার শর্ত যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান, অন্তত ৫০০ কোটি টাকার সম্পদসম্পন্ন মূলধননিবিড় কোম্পানি এবং নতুন প্রকল্পনির্ভর কোম্পানির ক্ষেত্রে কমিশন শর্তসাপেক্ষে ছাড় দিতে পারবে। এসব কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির পর সাধারণত দুই বছরের মধ্যে মুনাফায় পৌঁছানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে।

শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ ও বরাদ্দে নতুন শর্ত

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এ পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণের জন্য অন্তত চারটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। এর মধ্যে দুটি পরম মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং বাকি দুটি আপেক্ষিক মূল্যায়ন পদ্ধতি হতে হবে।

সাধারণ বিনিয়োগকারী ও অনিবাসী বাংলাদেশিদের জন্য শেয়ারের চাহিদা বরাদ্দের তুলনায় বেশি হলে লটারির মাধ্যমে শেয়ার বণ্টন এবং স্বয়ংক্রিয় বরাদ্দব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, লটারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও অ্যালগরিদম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

অন্যদিকে, আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু এবং বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সমন্বিত ব্যবস্থায় কোম্পানির তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিকে অন্তত ৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়তে হবে। উদ্যোক্তা বা বিদ্যমান শেয়ারধারীদের বিক্রির জন্য প্রতিশ্রুত শেয়ারের অন্তত ২৫ শতাংশ প্রথম লেনদেনের দিন বিক্রি করতে হবে। বাকি শেয়ার পরবর্তী ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রির বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশ প্রথম দিন থেকেই লেনদেনের জন্য উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অবশিষ্ট শেয়ারের মধ্যে ২৫ শতাংশের ওপর ৬০ দিন এবং আরও ২৫ শতাংশের ওপর ৯০ দিনের বিক্রয়-নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখার কথা বলা হয়েছে।

কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের ধারণ করা শেয়ারের ক্ষেত্রে দুই বছরের বিক্রয়-নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের তারিখ থেকে তিন বছর অথবা তালিকাভুক্তির পর দুই বছর, এই দুই সময়ের মধ্যে যেটি পরে শেষ হবে, সেই সময় পর্যন্ত শেয়ার বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিএসইসির প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। জনমত গ্রহণের পর প্রাপ্ত মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি পর্যালোচনা করে বিধিমালা চূড়ান্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *