মার্জিন বিধিমালা নিয়ে বিএসইসিকে সুপারিশ বিসিএমআইএ ’র
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, বাজারে তারল্য বৃদ্ধি এবং মার্জিন অর্থায়নে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’ নিয়ে মতামত ও সুপারিশ দিয়েছে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমআই)
সোমবার (৩ আগস্ট) বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটি এসব মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরে।
চিঠিতে বলা হয়, মার্জিন অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে অতিরিক্ত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন, তারল্য এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
বিসিএমআইএ জানিয়েছে, নতুন মার্জিন কাঠামোতে নিয়ন্ত্রক তদারকি, স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীর আর্থিক সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিসিএমআইএ প্রাথমিক পর্যায়ে বিনিয়োগকারীর নিজস্ব ইকুইটি ও মার্জিন ঋণের অনুপাত ১:১ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর নিজস্ব ১ লাখ টাকা থাকলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মার্জিন ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীর আর্থিক সক্ষমতা, লেনদেনের অভিজ্ঞতা, পোর্টফোলিওর মান ও ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতার ভিত্তিতে ঋণসীমা নির্ধারণের সুযোগ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় একক সিকিউরিটিতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বিনিয়োগ সীমা বাস্তবসম্মত নয় বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
কোনো বিনিয়োগকারী যদি শক্তিশালী মৌলভিত্তি ও পর্যাপ্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি যোগ্য কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে চান এবং অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান তা অনুমোদন করে, তাহলে তাকে নির্ধারিত ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে অধিক বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া উচিত।
পি/ই হিসাবের ক্ষেত্রে গত বারো মাসের আয় ব্যবহারের সুপারিশ
মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটিজ নির্ধারণে সর্বশেষ নিরীক্ষিত বার্ষিক ইপিএস’র পরিবর্তে সর্বশেষ চার প্রান্তিকের ইপিএস ব্যবহার করে গত বারো মাসের শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ভিত্তিতে পি/ই হিসাব করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
তাদের দাবি, এতে কোম্পানির বর্তমান আয় সক্ষমতা আরও বাস্তবভাবে প্রতিফলিত হবে এবং বিনিয়োগকারী ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
পি/ই সীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার দাবি
মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পি/ই সীমা ৩০-এর পরিবর্তে ৫০ নির্ধারণের সুপারিশ করেছে বিসিএমআইএ।
একই সঙ্গে পি/বি অনুপাতকে বাধ্যতামূলক যোগ্যতার মানদণ্ড না রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কারণ, বিভিন্ন খাতের কোম্পানির সম্পদ কাঠামো ও ব্যবসায়িক মডেল ভিন্ন হওয়ায় পি/বি সব কোম্পানির প্রকৃত মূল্যায়নকে প্রতিফলিত করে না বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
মার্জিন কল ও জোরপূর্বক বিক্রয় ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারী সুরক্ষার দাবি
সংগঠনটি জানিয়েছে, কোনো মার্জিন হিসাবে ইক্যুইটি রেশিও ৩০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে বিনিয়োগকারীকে আনুষ্ঠানিক মার্জিন কল দিতে হবে।
তবে জোরপূর্বক বিক্রয়ের আগে যথাযথ নোটিশ, সময়সীমা এবং প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। তাদের মতে, প্রয়োজন হলে পুরো পোর্টফোলিও বিক্রি না করে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় পরিমাণ সিকিউরিটিজ বিক্রি করতে হবে এবং বিক্রয়ের কারণ ও হিসাব বিনিয়োগকারীকে জানাতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের পুনর্বাসনের দাবি
বিগত সময়ে বাজার পতন ও কঠোর মার্জিন ব্যবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের পুনরায় বাজারে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি প্রোফাইল বিবেচনায় সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ক্রয় ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
জেড ক্যাটাগরির শেয়ারে শর্তসাপেক্ষ মার্জিন সুবিধার দাবি
সব জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটিজকে মার্জিন সুবিধার বাইরে না রেখে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী কোম্পানিকে শর্তসাপেক্ষে মার্জিন সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোম্পানির ব্যবসা কার্যক্রম, আর্থিক সক্ষমতা, তথ্য প্রকাশ ও করপোরেট সুশাসন বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির জবাবদিহি বাড়ানোর আহ্বান
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বিসিএমআইএ। সংগঠনটি বলেছে, কোনো কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে বিনিয়োগকারীর স্বার্থ ক্ষুণ্ন করলে দায়ী পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এছাড়া স্পন্সর ও পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ধারণের ন্যূনতম সীমা পর্যায়ক্রমে ৩০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাজারবান্ধব মার্জিন কাঠামোর আহ্বান
বিসিএমআইএ বলেছে, শুধু ঋণসীমা কঠোর করা বা অধিকাংশ সিকিউরিটিজকে মার্জিন সুবিধার বাইরে রাখার মাধ্যমে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বরং স্বচ্ছতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, দায়িত্বশীল অর্থায়ন এবং বাজারের স্বাভাবিক তারল্যের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কার্যকর মার্জিন বিধিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
