দরপতনে বিনিয়োগকারীদের হতাশা, বিএসইসির কার্যকর তদারকির দাবি
পুঁজিবাজার প্রেস প্রতিবেদক : দেশের শেয়ারবাজারে লভ্যাংশ ঘোষণার ভরা মৌসুম চললেও বাজারের সার্বিক পরিস্থিতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। বরং ধারাবাহিক দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার যথাযথ নজরদারি ও কার্যকর তদারকির অভাবেই শেয়ারবাজার প্রত্যাশিত গতির বিপরীতে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার পরও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরছে না।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণত লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুমে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে দরপতনের মুখে পড়ছে বাজার। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
তারা বলছেন, স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতিতে টানা কয়েক কার্যদিবস সূচক বাড়ার পর মুনাফা তুলে নেওয়া কিংবা দর সংশোধনের কারণে একদিন সূচক ও লেনদেন কিছুটা কমতে পারে।
এটি শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। অথচ বর্তমানে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো প্রবণতা। একটানা কয়েকদিন সূচক কমার পর কোনো কোনো দিন সামান্য উত্থান ঘটছে। এ ধরনের পরিস্থিতি বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের ভাষ্য, চলমান লভ্যাংশ মৌসুমে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানি উল্লেখযোগ্য হারে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এসব ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি বাজারে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার পরও অনেক কোম্পানির শেয়ারে প্রত্যাশিত চাহিদা তৈরি হচ্ছে না।
অন্যদিকে, কিছু কোম্পানি নামমাত্র লভ্যাংশ ঘোষণা করে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক ধরনের তামাশা করছে বলেও অভিযোগ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তবে তাদের উদ্বেগের প্রধান কারণ হচ্ছে, যেসব কোম্পানি তুলনামূলক ভালো ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লভ্যাংশ ঘোষণা করছে, সেসব কোম্পানির শেয়ারেও আশানুরূপ বিনিয়োগ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ফলে লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুমেও বাজারে প্রত্যাশিত গতি ফিরছে না।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নজরদারি আরও কঠোর ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শেয়ারবাজারের বর্তমান দুরবস্থার পেছনে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অস্বাভাবিক তৎপরতা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
বিশেষ করে বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে কারা প্রভাব বিস্তার করছে কিংবা নেপথ্যে থেকে কারসাজির মাধ্যমে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, তা শনাক্ত করতে কার্যকর অনুসন্ধান চালানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে নিবন্ধিত বিনিয়োগকারী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী এসব সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় এবং বাজার উন্নয়নে তাদের যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত পরামর্শ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাজার পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণে বিনিয়োগকারী সংগঠনগুলোর গ্রহণযোগ্য সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হলে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিএসইতে সূচক কমলেও বেড়েছে লেনদেন
এদিকে, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় টাকার অঙ্কে লেনদেন বেড়েছে। এদিন লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমেছে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বৃহস্পতিবার ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১৫ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪১৭ দশমিক ৪৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
একই দিনে ডিএসইর অপর দুই সূচকও নিম্নমুখী ছিল। শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ৩ দশমিক ৮২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০ দশমিক ৬৬ পয়েন্টে। অন্যদিকে, বাছাই করা ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৯ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট হারিয়ে ২ হাজার ৮৬ দশমিক ৮৬ পয়েন্টে নেমেছে।
এদিন ডিএসইতে মোট ৩৮৮টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ১৪৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে ১৯০টি প্রতিষ্ঠানের দর কমেছে এবং ৫৩টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
লেনদেনের পরিমাণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, বৃহস্পতিবার ডিএসইতে প্রায় ৫৬৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। এর আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৪০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের দিনের তুলনায় এদিন লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১২৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
সিএসইতে সূচক বাড়লেও লেনদেনে বড় পতন
অন্যদিকে, দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বৃহস্পতিবার সূচকের উত্থান ঘটলেও টাকার অঙ্কে লেনদেন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।
এদিন সিএসইতে মোট ১৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে এই বাজারে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
সিএসইতে বৃহস্পতিবার মোট ১৮২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৯০টি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে, ৭১টির দর কমেছে এবং ২১টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিন সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪৬ দশমিক ৩২ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৫৭৬ দশমিক ২৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর আগের কার্যদিবসেও সূচকটি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ওই দিন সিএএসপিআই বেড়েছিল ৪০ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট।
