সতর্ক বিনিয়োগে ধীর শেয়ারবাজার, বাড়ছে যাচাই-বাছাই
শেয়ারবাজারে নতুন করে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। পুঁজি সুরক্ষার পাশাপাশি সম্ভাব্য মুনাফার হিসাব কষেই এখন শেয়ার কেনাবেচা করছেন তারা। ফলে বাজারে লেনদেনের গতি কিছুটা ধীর হলেও বিনিয়োগকারীদের এই সতর্ক অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতের লোকসানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন আগের মতো যাচাই-বাছাই ছাড়া শেয়ার কিনছেন না। বরং কোম্পানি ও শেয়ারের অবস্থা পর্যালোচনা করে তুলনামূলক হিসাব-নিকাশ করেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এতে লেনদেনের গতি কমলেও বাজারের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের একক প্রচেষ্টায় শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়। কোনোভাবে স্থিতিশীলতা এলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাজারে টেকসই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও দায়িত্বশীল ও সতর্কভাবে লেনদেন করতে হবে।
বাজারে সূচক ও শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করলেই যাচাই-বাছাই না করে যেকোনো শেয়ার কিনলে বিনিয়োগ করা মূলধনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একইভাবে বাজারে পতন দেখা দিলে আতঙ্কিত হয়ে তাড়াহুড়ো করে লোকসানে শেয়ার বিক্রি করাও বাজারে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করে। বরং দরপতনের সময়ে ভালো শেয়ারের দাম কমে গেলে তা বিক্রি না করে সুযোগ বুঝে কেনার দিকেই নজর দেওয়া উচিত। কিন্তু অনেক বিনিয়োগকারী সেটি না করায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই শেয়ার কেনা বা বিক্রির প্রতিটি সিদ্ধান্তেই সতর্ক থাকা জরুরি।
গুজবে নয়, তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগ
বিনিয়োগকারীদের মতে, প্রকৃত অর্থে বিনিয়োগকারীরা সচেতন ও সতর্ক না হলে শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা আসবে না। এজন্য পুঁজিবাজার সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের যথাযথ জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন।
গুজবে কান না দিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ব্যবসা, আর্থিক অবস্থা ও অন্যান্য তথ্য সম্পর্কে জেনে তারপর শেয়ারে বিনিয়োগ করা উচিত। কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম কেন বাড়ছে বা কেন কমছে, সে বিষয়েও যথাযথ যাচাই-বাছাই করতে হবে।
তাদের মতে, ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করলে একদিকে যেমন পুঁজি সুরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা থাকে, অন্যদিকে তেমনি মুনাফা অর্জনের সুযোগও তৈরি হয়।
সূচক ও লেনদেন দুটিই কমেছে
এদিকে আজ ২৯ সেপ্টেম্বর শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকগুলো সামান্য কমেছে। একই সঙ্গে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের পাশাপাশি টাকার অঙ্কে লেনদেনও কমেছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরও কমেছে।
আজকের বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে সতর্কতার সঙ্গেই লেনদেন করছেন। একই সঙ্গে তারা বাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন, যা বাজারের জন্য ইতিবাচক।
তাদের মতে, যেসব বিনিয়োগকারীর কাছে পর্যাপ্ত অলস অর্থ রয়েছে, তারা জুন ক্লোজিং হওয়া ভালো কোম্পানির শেয়ার যাচাই-বাছাই করে কিনলে খুব শিগগিরই ভালো মুনাফা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে জুন ক্লোজিং হওয়া ভালো কোম্পানির শেয়ার সম্পর্কে তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক দরপতনের কারণে অনেক শেয়ারের দাম এমন পর্যায়ে এসেছে, যা বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল হতে পারে। তবে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও বাজারের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে বিভিন্ন ধরনের সেমিনার আয়োজনের প্রয়োজন রয়েছে, যাতে তারা পুঁজিবাজার সম্পর্কে যথাযথ ধারণা অর্জন করতে পারেন।
ডিএসইতে কমেছে সূচক ও লেনদেন
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, মঙ্গলবার সপ্তাহের তৃতীয় কর্মদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫২৪ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসইএস ২ দশমিক ১৪ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৮ দশমিক ০৪ পয়েন্টে। আর ডিএসই-৩০ সূচক ৩ দশমিক ২৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ৯৪ দশমিক ৬৭ পয়েন্টে।
এদিন ডিএসইতে মোট ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ১৪২টির শেয়ারদর বেড়েছে, ১৭৮টির কমেছে এবং ৭৫টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
ডিএসইতে মঙ্গলবার প্রায় ৬৩৪ কোটি ৫২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ৭৪৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে আগের দিনের তুলনায় আজ লেনদেন কমেছে প্রায় ১১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
সিএসইতে লেনদেন বেড়েছে
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে আজ ২৫ কোটি ৩১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে সিএসইতে শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছিল ১০ কোটি ৯৩ লাখ টাকার। অর্থাৎ আগের দিনের তুলনায় সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে।
সিএসইতে আজ লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৭০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৬টির শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে। বিপরীতে ৮২টির দর কমেছে এবং ২২টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিন সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৫ দশমিক ০২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৭৭২ দশমিক ৭৩ পয়েন্টে। এর আগের কার্যদিবসে সিএএসপিআই সূচক ৫ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট কমেছিল।
সব মিলিয়ে, চলমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান এবং যাচাই-বাছাই করে লেনদেনের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজি সুরক্ষা, ভালো কোম্পানি নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ কৌশল।
