২৩ কোম্পানির ডিভিডেন্ড শূন্য, বড় অঙ্কের লোকসানে একাধিক প্রতিষ্ঠান
পুঁজিবাজার প্রেস প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একের পর এক কোম্পানির দুর্বল আর্থিক চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ৩০ জুন, ২০২৬ অর্থবছরে শেয়ারবাজারের ২৩টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, ডিএসইর তালিকাভুক্ত শতাধিক কোম্পানির ডিভিডেন্ড সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর দেখা যায়, ৮২টি প্রতিষ্ঠান ক্যাশ কিংবা স্টক ডিভিডেন্ডের অনুমোদন দিলেও ২৩টি কোম্পানি সম্পূর্ণ ‘নো ডিভিডেন্ড’ বা শূন্য হাতে খালি মুখে ঝুলিয়েছে বিনিয়োগকারীদের।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তালিকাভুক্ত এসব কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া এবং পরিচালনগত নানান সংকটই ডিভিডেন্ড না দেওয়ার প্রধান কারণ। দীর্ঘদিনের জমে থাকা লোকসানের বোঝা কমানো, কাঁচামালের চড়া মূল্য, উৎপাদনক্ষমতার সঠিক ব্যবহার না হওয়া এবং অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণের বিপরীতে চড়া সুদ মেটাতে গিয়ে কোম্পানিগুলো তারল্যসংকটে পড়েছে। অর্জিত আয় দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটানোতেই হিমশিম খাচ্ছে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠান, ফলে ডিভিডেন্ড দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তাদের নেই।
‘নো ডিভিডেন্ড’-এর তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চড়া মূল্য চুকাচ্ছে চিনি ও সিমেন্ট খাতের প্রতিষ্ঠান। ডিএসইর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বেশি শেয়ারপ্রতি লোকসান গুনতে হয়েছে জিল বাংলা সুগার মিলসকে, যার লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭২.৩২ টাকা। এছাড়া মেঘনা সিমেন্ট শেয়ারপ্রতি ৬৩.৬৮ টাকা, শ্যামপুর সুগার মিলস ৪২.৯৪ টাকা এবং বসুন্ধরা পেপার মিলস ৪২.৭৪ টাকা লোকসান গুনেছে। পাশাপাশি জুট স্পিনার্স ৪০.২০ টাকা এবং রেনউইক যজ্ঞেশ্বর ১০.৬৩ টাকা শেয়ারপ্রতি লোকসান হিসাব দেখিয়েছে।
একই সঙ্গে বাজার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশও (আইসিবি) বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে আইসিবি শেয়ারপ্রতি ৭.৫২ টাকা সমন্বিত লোকসান ঘোষণা করেছে এবং কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ৩৭.৪৫ টাকা থেকে কমে ৩০.২৬ টাকায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ইউসুফ গ্লাস, আজিজ পাইপস, আইএসএন, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ও বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমসের (বিবিএস) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় আরও বড় ও উদ্বেগজনক হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি বিস্ময় তৈরি করেছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান, যেগুলো মুনাফায় থাকা সত্ত্বেও ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা থেকে বিরত থেকেছে। দেশবন্ধু পলিমার শেয়ারপ্রতি ৩.১৫ টাকা এবং মুন্নু অ্যাগ্রো ০.০৪ টাকা ইপিএস অর্জন করলেও বিনিয়োগকারীদের ঝুলিতে একটি পয়সাও দেয়নি। কোম্পানিগুলোর এমন আচরণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, কারণ ব্যবসায় টিকে থেকে মুনাফা করেও ডিভিডেন্ড বঞ্চিত রাখা বাজারের আস্থাকে আরও ক্ষুণ্ণ করছে।
টানা ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী ইতোমধ্যে চার প্রতিষ্ঠানকে ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে নিম্নমানের ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস (বিবিএস), ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক (আইএসএন), দেশবন্ধু পলিমার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আইসিবি। ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থান দেওয়ায় ডিএসইর নিয়ম অনুযায়ী এখন থেকে এসব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ে বিনিয়োগকারীরা কোনো ধরনের মার্জিন ঋণ সুবিধা বা অতিরিক্ত বিনিয়োগ সুবিধা পাবেন না।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে চরম অস্থিরতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, তালিকাভুক্ত মূলধনী প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন অব্যাহত লোকসান ও ডিভিডেন্ডে ‘লাল বাতি’ জ্বালানো শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ঘুরে দাঁড়ানোর পথকে আরও কঠিন করে তুলছে। বাজারকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার শক্ত তদারকি ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই পুনর্গঠন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
