শনিবার, আগস্ট ১, ২০২৬
আজকের সংবাদ

আগামী কাল থেকে নীতি সুদহার কমিয়ে বড় বার্তা দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

দীর্ঘ ২১ মাস কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর অবশেষে নীতি সুদহার (রেপো রেট) কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে নতুন হার ৯ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী রোববার থেকে নতুন এ হার কার্যকর হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমবে। এর ফলে ধীরে ধীরে ঋণের সুদহারও কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সিদ্ধান্তটির প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম সভায় ৫০ বেসিস পয়েন্ট নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নীতি সুদহার বা রেপো রেট হলো সেই সুদের হার, যে হারে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্পমেয়াদে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিয়ে থাকে। এটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান মুদ্রানীতির হাতিয়ার।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, নীতি সুদহার কমানোর প্রভাব ধীরে ধীরে ঋণের সুদে পড়বে। কোনো কোনো ব্যাংকে ঋণের সুদ ০.৫ শতাংশ, আবার কোথাও ১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে আমানতের সুদহারও কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ সুদহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, ডলারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছানোয় নতুন শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ কঠিন হয়ে পড়েছিল।

তবে তাদের মতে, শুধু সুদ কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে না। এর পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কমেছে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নীতি সুদহার কমানোর ইতিবাচক প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে। তবে ব্যবসা চাঙা করতে সুদ কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশে গত তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে। কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণের পরও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামানো সম্ভব হয়নি।

অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, সুদহার কমলে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে এবং বাজারে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির মূল কারণ সুদের হার নয়; বরং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সরবরাহ সংকট এবং অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যা। তাই নীতি সুদহার কমানোর কারণে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা কম।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত এমন বার্তা দিতে পারে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার এবং বাজার ব্যবস্থার সমস্যাগুলো এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

তার মতে, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া শুধু সুদ কমালে বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।

তিনি আরও বলেন, টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে শুধু সুদ কমানো যথেষ্ট নয়। ব্যবসার ব্যয় কমানো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়ানো জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *