শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
ব্যাংক

তারল্যসংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরল ন্যাশনাল ব্যাংক

পুঁজিবাজার প্রেস প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের তারল্যসংকট কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে ব্যাংকটির শাখা ও এটিএম বুথে গ্রাহকেরা চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শাখায় নতুন করে আমানত জমা দিচ্ছেন ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকেরা। রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা ও ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখা ঘুরে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন ও জমা দেওয়ার এমন চিত্র দেখা গেছে।

এর আগে ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা চালুর কথা জানিয়েছিলেন ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবীন। একই সঙ্গে সব শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নিশ্চিত করার কথাও জানান তিনি।

ন্যাশনাল ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় বৃহস্পতিবার ক্যাশ কাউন্টার থেকে ২০ হাজার টাকা তোলেন গ্রাহক এম এ খান। তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, গত দুই বছরে ব্যাংকটিতে যে সেবা পেয়েছেন, বৃহস্পতিবারের চিত্র তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ধরনের আবেদন ছাড়াই টাকা তুলতে পেরে তিনি খুশি।

শাখাটির ব্যবস্থাপক রোকসানা পারভিন জানান, গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের আবেদন প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদনের অপেক্ষা না করে শাখা থেকেই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার ওই শাখায় ৭৩ লাখ টাকা জমা পড়েছে। অন্যদিকে, গ্রাহকেরা এখন পর্যন্ত ৬ লাখ টাকা তুলেছেন। আমানত জমা দেওয়া গ্রাহকদের মধ্যে এইচ ইন্টারন্যাশনাল ও এইচপি ট্রেডার্স রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি ৩০ লাখ টাকা করে জমা দিয়েছে। মতিঝিলের দিলকুশা শাখায়ও গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আমানতের টাকা পরিশোধ করতে দেখা গেছে।

শাখাটির কার্যক্রম ব্যবস্থাপক চন্দন কুমার দাস জানান, ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৬৪ জন গ্রাহক আমানতের টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার আবেদনকারীদের বাইরেও প্রায় ১০০ জন গ্রাহককে আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকপ্রতি সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়েছে।

শাখাটির গ্রাহক শামসুজ্জোহা জানান, বৃহস্পতিবার একটি চেকের মাধ্যমে তিনি এক লাখ টাকা তুলেছেন। তাঁর ভাষ্য, চাইলে এর চেয়ে বেশি টাকাও তুলতে পারতেন।

শাখাটির এক নারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ৩৬ জন গ্রাহককে সেবা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়।

ন্যাশনাল ব্যাংকের মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায়ও আমানত উত্তোলনের আবেদনের বিপরীতে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

শাখাটির দ্বিতীয় ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান জানান, কয়েকটি নতুন হিসাব খোলা হচ্ছে, যেগুলোর প্রতিটিতে দুই কোটি টাকার বেশি অর্থ রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২০ জন গ্রাহককে তাঁদের আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, ডিজে গার্মেন্টস তাদের ঋণপত্রের বিপরীতে প্রায় ৩১ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। রাজধানী ট্রেডার্সের নামেও ৬ লাখ টাকা জমা হয়েছে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবীন বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বেশ কয়েকটি শাখা ঘুরে তিনি গ্রাহকদের সন্তুষ্টি দেখেছেন। গ্রাহকেরা তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছেন। তিনি বলেন, গ্রাহকদের সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করতে বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ব্যাপক পরিশ্রম করেছে। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

মেহজাবীন আরও জানান, ব্যাংকটির সব শাখা ও এটিএম বুথ থেকে টাকা দেওয়া হচ্ছে। কোনো শাখায় সেবা পেতে বিলম্ব হলে গ্রাহকদের বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান তিনি।

এর আগে ১১ অক্টোবর থেকে বড় অঙ্কের আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনের আবেদন নেওয়া শুরু করে ব্যাংকটি। চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটি পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছিল না।

তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ব্যাংকটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হয়েছে। এখন গ্রাহকেরা ঋণপত্র খুলতে পারছেন। পাশাপাশি চেক, আরটিজিএস, এনপিএসবি ও অন্যান্য প্রচলিত সেবার মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করতে পারছেন।
ন্যাশনাল ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করতে আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকটি ৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক এ অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছে।

তবে এ অর্থ ব্যবহারে কয়েকটি শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে, তারল্য সহায়তার অর্থ থেকে ব্যাংকটির সাবেক বা বর্তমান কোনো পরিচালকের আমানত ফেরত দেওয়া যাবে না। একই অর্থ ব্যবহার করে নতুন ঋণও বিতরণ করা যাবে না।

গত সোমবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে এসব নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠি অনুযায়ী, এ ঋণের সুদহার ১০ শতাংশ এবং মেয়াদ তিন মাস।

ব্যাংক সূত্র জানায়, গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনে প্রায় ১১ হাজার গ্রাহক মোট ২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। দেশজুড়ে ব্যাংকটির শাখাগুলো থেকে গ্রাহকদের চাহিদার তথ্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে সেই অনুযায়ী শাখাগুলোতে অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে কয়েক দিন আবেদনকারী গ্রাহকদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটি। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অন্য গ্রাহকদেরও আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ন্যাশনাল ব্যাংক দেশের প্রথম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। একসময় ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান মেলিতা মেহজাবীন। তাঁর আশা, সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা স্বাভাবিক হওয়ায় গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসবে এবং তাঁরা আবারও ব্যাংকটিতে আমানত জমা দেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *