শনিবার, জুন ১৩, ২০২৬
এক্সক্লুসিভ

প্রভাবশালী গ্রাহকদের কাছে আটকে আছে ব্যাংকের ৭৬ হাজার কোটি টাকা

আদালত থেকে স্থগিতাদেশ বা স্টে অর্ডার নিয়ে কিছু প্রভাবশালী গ্রাহক ব্যাংকের ৭৬ হাজার কোটি টাকা আটকে রেখেছেন। এসব ঋণের বেশির ভাগই খেলাপিযোগ্য।
ব্যাংকাররা বলছেন, আদালতের স্থগিতাদেশ বা স্টে অর্ডার নেওয়ার কারণে দীর্ঘদিন থেকে ঝুলে আছে ঋণগুলো, যা ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ রয়েছে, তার সঙ্গে স্টে অর্ডারের অর্থ যোগ করলে দেশের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ঋণ মন্দ হয়ে পড়বে, যা একটি গণতান্ত্রিক দেশের অর্থনীতির সঙ্গে পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ব্যাংকখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। তারপরও ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করেই লাপাত্তা। সুরাহা হচ্ছে না কোনো ঋণের। সাজা হচ্ছে না সংশ্লিষ্ট অপরাধীর। টাকাও ফেরত আসছে না। বিচার না হওয়ায় নামে-বেনামে ঋণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, অর্থঋণ আদালতে খেলাপি ঋণের মামলার স্তূপ বেড়েই চলেছে। গত মার্চ শেষে দেশের ৬০টি ব্যাংকের অর্থঋণ আদালতে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ সাত হাজার ৫৯৩টি। এসব মামলায় আটকে আছে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ি, গত বছরের ডিসেম্বরে মামলার সংখ্যা ছিল দুই লাখ ছয় হাজার ৫৮৪টি, এর বিপরীতে জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ২৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। ফলে চলতি বছরের তিন মাসে মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় এক হাজার ৯টি। আর জড়িত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ১০ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বের করা ঋণ স্বাভাবিক নিয়মে আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। বারবার সুবিধা ও ছাড় দেওয়ার পরও এসব ঋণ ফেরত দিচ্ছেন না খেলাপিরা। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এসব ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা হলেও নিষ্পত্তি হচ্ছে খুবই কম।
ভূক্তভোগি ব্যাংকাররা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা কম হওয়া ও বিচারকের অভাব এবং আইনি মতামতের জন্য ব্যাংকের আইনজীবীকে পর্যাপ্ত সময় ও সহায়ক জামানতের পর্যাপ্ত দলিলাদি সরবরাহ করতে না পারায় অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।
বিষয়টির বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল আমিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘অর্থঋণ আদালত খুবই কার্যকর একটি আদালত। কিন্তু এটা অকার্যকর হয়ে আছে। কারণ এখানে পর্যাপ্ত লোকবল ও আদালতের অভাব রয়েছে। তাই দিনের পর দিন মামলার স্তূপ বেড়েই চলেছে। তা ছাড়া একটি বড় অঙ্ক প্রভাবশালীরা স্টে অর্ডার বা রিট করার মাধ্যমে ঝুলিয়ে রেখেছেন, যেটা ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলছে।’
বিশিষ্ট এ ব্যাংকার আরো বলেন, ‘আমরা বহুদিন থেকে বলে আসছি যদি কোনো গ্রাহক উচ্চ আদালতে রিট করেন, তাহলে যেন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা (২০ শতাংশ, ৩০ শতাংশ) জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়। কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি। তাই দিনের পর দিন রিটের সংখ্যা ও আটকে থাকা টাকার পরিমাণ বাড়ছে। ব্যাংক খাতের এই ক্রান্তিকালে তারা যদি এই টাকাগুলো ফেরত পেত তাহলে ব্যাংকের সমস্যা আর থাকত না। অটোমেটিক্যালি অর্থনীতি উপকৃত হতো। তাই কেউ স্টে অর্ডার নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট জমা রাখার বিধান চালু করা উচিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *