সোমবার, মে ৪, ২০২৬
এক্সক্লুসিভ

বন্ধ কারখানা চালু করতে ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশে পণ্য উৎপাদন বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সুরক্ষা এবং চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রপ্তানি খাতকে সহায়তার লক্ষ্যে, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো ফের চালু করতে ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) স্কিম চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার বিষয়ে অবহিত কর্মকর্তারা ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-কে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে একটি নীতিগত প্রস্তাব তৈরি করছে, যা চলতি সপ্তাহেই অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী সায় দিলেই এই স্কিমটি বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক সার্কুলার জারি করা হবে।

প্রস্তাবিত প্যাকেজের আওতায়– বড় শিল্পখাতে ২০ হাজার কোটি টাকা; কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং কৃষিখাতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে।

স্বল্পমেয়াদি এই সুবিধা চলতি মূলধন ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে, এর মেয়াদ হবে এক থেকে দেড় বছর। এই অর্থ পেয়ে কারখানা মালিকরা পুনরায় উৎপাদনে যেতে পারবেন এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ক্যাপিটাল মেশিনারি চালু করতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যেসব ব্যবসা আগে সচল ছিল কিন্তু কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে সংকটে পড়েছে, তারাই এই তহবিলের সুবিধা পাবে। তিনি আরও যোগ করেন, তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে যেসব প্রতিষ্ঠানের হাতে নিশ্চিত ক্রয়াদেশ (কনফার্মড অর্ডার) এবং পণ্যের বাজার চাহিদা রয়েছে, তাদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

অর্থায়নের উৎস নিয়ে আলোচনা

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে নাকি সরকারি অর্থায়নে এই তহবিল গঠন হবে—তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান তারল্য সংকটের কারণে এই পুনঃঅর্থায়ন স্কিমটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই অর্থায়ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে, কারণ বাজারে নতুন করে নগদ অর্থের জোগান বেড়ে গেলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

আশা করা হচ্ছে, ব্যাংকগুলো ৫-৬ শতাংশ সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই তহবিল গ্রহণ করতে পারবে। অন্যদিকে, গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদহার বর্তমান মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে সামান্য বেশি হবে, কিন্তু নীতি সুদহারের (পলিসি রেট) চেয়ে কম নির্ধারণ করা হতে পারে।

১২০০-এর বেশি বন্ধ কারখানা শনাক্ত

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বন্ধ শিল্প ইউনিটগুলো পুনরায় চালুর মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই উদ্যোগটি তারই ধারাবাহিকতায় আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে—বন্ধ এবং আংশিক চালু থাকা কারখানাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় ঋণগ্রহীতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মিলিয়ে এমন ১,২০০টিরও বেশি শিল্প ইউনিট শনাক্ত করা হয়েছে।

১০০ কোটি টাকার উপরে এবং তার চেয়ে নিচে থাকা বকেয়া ঋণের ভিত্তিতে—কারখানাগুলোর দুটি পৃথক তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সাথে বৈঠক করে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো শনাক্ত করার কাজ সম্পন্ন করেছে।

যেসব বন্ধ কারখানার বাজার সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো চালু করতেই মূলত এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কারখানা যদি ঋণখেলাপি হয়ে থাকে, তাহলে তহবিল সুবিধা দেওয়ার আগে—সহজ শর্তে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হবে।

এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “ব্যাংকগুলো থেকে তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বন্ধ কারখানা চালু করতে কী ধরনের সুবিধা দেওয়া যায়, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পর তহবিল গঠন ও নীতিমালা জারি করা হবে।”

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য একই রকম সহায়তার উদ্যোগ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক বেকার হওয়া এবং রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব কমাতে—সংকটাপন্ন কিছু শিল্পগোষ্ঠীকে সীমিত সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথমে বেক্সিমকো গ্রুপকে সহায়তা দেওয়া হয়। বেক্সিমকোর বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৪টি ইউনিটের প্রায় ২৭ হাজার শ্রমিকের পাওনা পরিশোধে সরকার প্রায় ৫২৫ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেয়। এর লক্ষ্য ছিল শ্রমিক অসন্তোষ প্রশমিত করা এবং আংশিকভাবে হলেও উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখা।

একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা নাসা গ্রুপকেও সহায়তার আওতায় আনা হয়। ঋণখেলাপির কারণে ব্যাংকগুলো এলসি সুবিধা দিতে অনাগ্রহী হওয়ায় গ্রুপটির ২৫–২৭ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে। এ অবস্থায় সরকার নীতিগত সহায়তা দিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার সুযোগ তৈরি করে, যাতে নতুন রপ্তানি আদেশ নেওয়া সম্ভব হয়।

এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার রপ্তানি আয়ের অর্থ ব্যবহারে অগ্রাধিকার পরিবর্তন করে—প্রথমে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও চলতি ব্যয় মেটানোর নির্দেশনা দেয়; ঋণের কিস্তি পরিশোধ পরে করার সুযোগ রাখা হয়। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হয়।

অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন

অর্থনীতিবিদরা নীতিগতভাবে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই পরিকল্পনা উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে, তবে এই কারখানাগুলোর জন্য অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই এখানে মূল চিন্তার বিষয়।

বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর আগে—বর্তমান অবস্থা অনুযায়ী সেগুলোর শ্রেণিবিন্যাস করার ওপর জোর দিয়েছেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু কারখানা সুনির্দিষ্ট সমস্যা কাটিয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনায় ভালো করতে পারলেও, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যে সেগুলো আর পুনরুদ্ধারের যোগ্য নয়।

তার মতে, এই বিশেষ তহবিল বা পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা কেবল সেই সব প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া উচিত, যারা একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল দেখাতে পারবে। মোস্তাফিজুর বলেন, সফলভাবে এসব কারখানা চালু করতে পারলে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি ভ্যাট ও কর সংগ্রহের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, যা জাতীয় বাজেট ঘাটতি মেটাতে সহায়ক হবে। তবে অলাভজনক কোনো কারখানাকে কৃত্রিমভাবে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে না বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ

ফাহমিদা খাতুন মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, “বর্তমানে অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে এবং সরকারের রাজস্ব প্রবৃদ্ধিও চাপের মুখে রয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি রিফাইন্যান্স স্কিমের আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করে, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ সরবরাহ করা হলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাবে।”

তিনি দুটি পরামর্শ দেন—প্রথমত, যেসব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো, সেখান থেকে আংশিকভাবে তহবিল সংগ্রহ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আসন্ন জাতীয় বাজেট থেকে একটি অংশ এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি তিনি ধাপে ধাপে (গ্র্যাজুয়ালি) এই স্কিম বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, এই তহবিল যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তৈরি করা অর্থের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়, তাহলে বাজারে অর্থের সরবরাহ (মানি সাপ্লাই) বেড়ে যাবে, যার ফলে সরাসরি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে। তিনি বলেন, “পুরো টাকাটি যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আসে, তাহলে শুধু ৪০ হাজার কোটি টাকাই বাজারে যুক্ত হবে না; মানি মাল্টিপ্লায়ার প্রভাবে এই অর্থ কয়েক গুণ বেশি প্রভাব ফেলতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।”

তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু, যদি সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বেশি অগ্রাধিকার দেয় এবং সেই অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে নীতিগত ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে।

মহামারির সময় দেওয়া প্রণোদনা থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় ২০২০ সালে বিভিন্ন খাতে ২৩টি আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল আওয়ামী সরকার, যার মোট পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। সেসময় বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে টাকা ছাপিয়ে এই প্রণোদনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। তবে এসব ঋণের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে খেলাপিতে পরিণত হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সহজ শর্তে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়ে কারখানাগুলোকে কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি সুবিধা দিতে হবে। তবে অর্থপাচার বা অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধার আওতায় আসবে না। একই সঙ্গে নতুন করে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি যাতে না ঘটে, সেদিকেও কঠোর নজরদারি রাখা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *