বাণিজ্যিক ঋণের পর পোশাক খাতই শীর্ষ খেলাপি
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ঋণ একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়। ব্যাংকগুলো এককভাবে এই খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে। মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ২৪ শতাংশই এ খাত থেকে নেওয়া ঋণ।
বাণিজ্যিক ঋণের পর পোশাক খাতই শীর্ষ খেলাপি। এ খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় ১৬ শতাংশ।
সব মিলিয়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশের জন্য এই শীর্ষ দুটি খাত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত ফিনান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট, ২০২২ রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, বাণিজ্যিক ঋণের জন্য খুব বেশি নথিপত্রের প্রয়োজন হয় না। কিছু ব্যাংক সহজেই এই ঋণ দেয়। এর আগে এ খাতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ঋণ দিয়ে ফাঁদে পড়ে অনেক ব্যাংক। এখন আবার কিছু ব্যাংক এ খাতে ঋণ দেওয়ার দিকে ঝুঁকছে, যা সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বাণিজ্যিক ঋণের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংও সহজ। পণ্যের পরিমাণ বেশি হওয়ায় তা সবসময় যাচাই করা হয় না। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই নির্বাচনী হতে হবে।
আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের শেষে ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য বা বাণিজ্যিক খাতে। এ খাতে ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৮৮ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ৯০২ কোটি বা ১০ শতাংশ। ২০২১ সালে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা।
ঋণের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প খাত। ২০২২ সালের শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৯ হাজার ৬০৯ কোটি বা ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এরপর পোশাক খাতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। ২০২২ সালের শেষে পোশাক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।
নির্মাণ, পরিবহন ও যোগাযোগ ও অন্যান্য সেবা খাতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ২৮৯ কোটি বা ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। বস্ত্র খাতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৭ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা, এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৪ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা।
যেসব খাতে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে তার মধ্যে রয়েছে কৃষিভিত্তিক শিল্প। এসব খাতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ৯ হাজার ৪১ কোটি টাকা।
এদিকে জাহাজ ভাঙা ও নির্মাণ শিল্পে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। ২০২২ সালের শেষে এ খাতে ঋণ ছিল ২১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা বা ২২ দশমিক ৪৩ শতাংশ খেলাপি। এরপর খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণের হারে শীর্ষে রয়েছে বস্ত্র ও পোশাক খাত।
গত বছর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১২০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।
এ ছাড়া গত বছর শেষে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এছাড়া ফোরক্লোজ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৯ হাজার ৭২১ কোটি টাকা।
ফলস্বরূপ, ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (CAR) অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন। ২০২২ সালে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। কিন্তু সে সময় পাকিস্তানে ব্যাংকের এই অনুপাত ছিল ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারতে ১৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক ঋণে অনেক ব্যাংকের টাকা আটকে আছে। বাণিজ্যিক ঋণের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংও সহজ। পণ্যের পরিমাণ বেশি হওয়ায় তা সবসময় যাচাই করা হয় না। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই নির্বাচনী হতে হবে। ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় একধরনের প্রতিযোগিতাও রয়েছে, যা ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
