বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
আজকের সংবাদ

উত্থান-পতনের দোলাচলে শেয়ারবাজার, প্রশ্নে কমিশনের ভূমিকা

পুঁজিবাজার প্রেস প্রতিবেদক : দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছিল বর্তমান নিয়ন্ত্রক কমিশন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজারে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেওয়ায় সূচক ও লেনদেনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। একপর্যায়ে প্রধান সূচক প্রায় ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছায় এবং দৈনিক লেনদেন বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এতে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সেই ইতিবাচক পরিস্থিতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বরং ধারাবাহিক দরপতন ও লেনদেন কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে হতাশা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুমে কয়েকটি কোম্পানি রেকর্ড পরিমাণ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও বাজারে প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব না পড়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণের পর শেয়ারবাজার যে গতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এত দিনে বাজার আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। কেন এবং কী কারণে বাজারের ইতিবাচক প্রবণতা হঠাৎ নেতিবাচক ধারায় রূপ নিয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

বাজারের আগের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের আগে গত ৩ জুন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক প্রায় সাড়ে ৫ হাজার পয়েন্টে অবস্থান করছিল। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে থাকে। একপর্যায়ে সূচক ও লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটে। প্রধান সূচক প্রায় ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। একই সময়ে দৈনিক লেনদেন প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।

এই উত্থানের ফলে দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। বাজারে বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি বাড়ার পাশাপাশি লেনদেনেও গতি ফিরে আসে। আগস্ট মাস পর্যন্ত বাজারের পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল ছিল বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

তবে আগস্টের পর থেকে বাজারের চিত্র ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। প্রথমদিকে সূচক ও লেনদেনে কিছুটা ধীরগতির পতন দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে সেই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও তীব্র হয়। একপর্যায়ে ধারাবাহিক দরপতন বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও। ফলে বাজারের প্রতি তাদের আস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিনিয়োগকারীদের একাংশের অভিযোগ, যে কমিশনের সময়ে বাজারে নতুন করে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেই কমিশনের দায়িত্ব পালনকালেই বাজার আবার গভীর সংকটে পড়েছে। তাদের প্রশ্ন, বাজার যখন স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন এমন কী ঘটল যে হঠাৎ করে ধারাবাহিক পতন শুরু হলো? বাজারের এই পরিবর্তনের পেছনে প্রকৃত কারণ কী এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা কী ধরনের কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

তাদের মতে, বর্তমান কমিশনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তা অনেকটাই হতাশায় পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিক দরপতনের কারণে অনেক বিনিয়োগকারীর আস্থা এখন তলানিতে পৌঁছেছে। অথচ একই কমিশনের সময়েই বাজার একপর্যায়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল অবস্থানে পৌঁছেছিল।

এদিকে, অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এক বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু বাজারের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে সেই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিনিয়োগকারীরা।

তাদের ভাষ্য, বাজারের চেহারা বদলে যাওয়ার অর্থ যদি ধারাবাহিক পতনের মাধ্যমে সূচক আরও নিচে নেমে যাওয়া হয়, তাহলে সেটি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত পরিবর্তন হতে পারে না। বরং বাজারের উন্নয়ন বলতে তারা স্থিতিশীলতা, স্বাভাবিক লেনদেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাকেই বোঝেন।

বিশেষ করে বর্তমানে শেয়ারবাজারে লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম চলছে। এ সময়ে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করছে। কয়েকটি কোম্পানি রেকর্ড পরিমাণ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও বাজারে তার প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে ভালো লভ্যাংশের খবরও কেন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পর্যাপ্ত আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারছে না, সেটি খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, লভ্যাংশ ঘোষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমেও যদি বাজারে এমন দুর্বল পরিস্থিতি বিরাজ করে, তাহলে সাধারণ সময়ে বাজারের স্থিতিশীলতা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়। এ অবস্থায় বাজারের প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

তারা আরও বলেন, শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল রাখা শুধু নিয়ন্ত্রক কমিশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সরকার, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বড় পুঁজির বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তবে বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসিকেই সমন্বয় ও কার্যকর তদারকির ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিমত, বর্তমান কমিশনের সময়ে বাজারের যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আবার একই কমিশনের দায়িত্ব পালনকালেই বাজারে যে হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না। তাই অতীতের সাফল্যের ওপর নির্ভর না করে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।

তাদের মতে, বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং বড় পুঁজির বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

বাজারে এসব পক্ষের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ না থাকাকে বর্তমান দুর্বল পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বড় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে গেলে বাজারে লেনদেনের গতি ও তারল্য সংকুচিত হতে পারে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। ফলে বাজারে আস্থা ফেরাতে কোম্পানির পরিচালক, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও বড় পুঁজির বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বাজারের সার্বিক কার্যক্রমে নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, বাজারে অস্বাভাবিক দরপতনের পেছনে কোনো ধরনের পরিকল্পিত অপতৎপরতা কিংবা কারসাজির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তদন্তে বাজারকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান কমিশন আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। এজন্য ধারাবাহিক পতনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বাজারে সব পক্ষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

ডিএসইতে সূচক ও লেনদেন বেড়েছে

এদিকে, বুধবার (২৮ অক্টোবর) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক ও টাকার অঙ্কে লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে এদিন লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪৬ দশমিক ৭২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৪৩৩ দশমিক ২৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

একই দিনে ডিএসইর শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ৭ দশমিক ৭১ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৫৪ দশমিক ৪৮ পয়েন্টে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৮ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৯৬ দশমিক ২৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

বুধবার ডিএসইতে মোট ২৯১টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নিয়েছে বলে বাজারের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে। বিপরীতে ৭৬টির দর কমেছে এবং ৫২টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

এদিন ডিএসইতে প্রায় ৪৪০ কোটি ৯৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক দিনের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৩৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

সিএসইতেও সূচক ও লেনদেনে উত্থান

অন্যদিকে, দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও বুধবার সূচক ও লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিন সিএসইতে মোট ৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট কেনাবেচা হয়েছে। আগের কার্যদিবসে বাজারটিতে লেনদেন হয়েছিল ১৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে সিএসইতে লেনদেন বেড়েছে ৪৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে বুধবার মোট ১৬২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৮৪টি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে। অন্যদিকে, ৭০টি প্রতিষ্ঠানের দর কমেছে এবং ৮টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

এদিন সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪০ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ হাজার ৫২৯ দশমিক ৯৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর আগের কার্যদিবসে সূচকটি ৬৯ দশমিক ০৩ পয়েন্ট কমেছিল।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বুধবার উভয় শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেন বাড়ার বিষয়টি ইতিবাচক হলেও এক দিনের উত্থান দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিবর্তন মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবণতা, বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *