রবিবার, মে ১৭, ২০২৬
এক্সক্লুসিভ

পুঁজিবাজারে বাড়ছে নিয়ম’ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা

pujibazarpress.com. পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিয়ম’ সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নতুন ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (করপোরেট গভর্ন্যান্স) রুলস, ২০২৬’ জারি করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। নতুন এই বিধিমালায় বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম), ডিভিডেন্ড বিতরণ, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব এবং আর্থিক তথ্য প্রকাশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসইসি সূত্র।
এজিএম আয়োজনের নিয়মে কঠোরতা

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে প্রতি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার বছরে বাধ্যতামূলকভাবে এজিএম আয়োজন করতে হবে এবং তা পরিচালিত হবে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুসারে। এছাড়া রেকর্ড ডেট বা বুক ক্লোজার শুরুর ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে এজিএম সম্পন্ন করতে হবে।

সহজভাবে বললে—কোনো কোম্পানি যদি ১ জুন রেকর্ড ডেট ঘোষণা করে, তাহলে তাদের সর্বোচ্চ ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে এজিএম সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাৎ সভা বিলম্বিত করার সুযোগ অনেক কমে যাচ্ছে।

নোটিশ ও তথ্য প্রকাশে নতুন বাধ্যবাধকতা

এজিএম বা বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম)-এর নোটিশ সভার কমপক্ষে ২১ দিন আগে শেয়ারহোল্ডার ও স্টক এক্সচেঞ্জে পাঠাতে হবে। একইসঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে ও নিউজ পোর্টালে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি কোম্পানির ওয়েবসাইটেও তা প্রকাশ করতে হবে। এমনকি বিও হিসাবে সংরক্ষিত ই-মেইল ঠিকানায়ও নোটিশ পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অর্থাৎ একজন বিনিয়োগকারী যেন “আমি জানতাম না” বলার সুযোগ না পান—সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সভার ভিডিও রেকর্ড বাধ্যতামূলক

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ সভার পুরো কার্যক্রমের অডিও-ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তিন কার্যদিবসের মধ্যে সম্পাদনাবিহীন ভিডিও কপি কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে, এজিএমে যদি কোনো শেয়ারহোল্ডার প্রশ্ন করেন—“কোম্পানির মুনাফা কমেছে কেন?”—তখন সেই আলোচনা আর গোপন থাকবে না। প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুরো ভিডিও পর্যালোচনা করতে পারবে।

এছাড়া সভায় কোনো মূল্যসংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ করতে হবে।

ডিভিডেন্ড না দিলে কারণ জানাতে হবে

ডিভিডেন্ড নীতিতেও আনা হয়েছে নতুন শর্ত। কোনো কোম্পানি আংশিক বা কোনো ডিভিডেন্ড না দিলে তার কারণ এবং অবিতরিত মুনাফা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা এজিএমের রেজুলেশনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

তবে অন্তত ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা কোম্পানিগুলো এ বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকবে।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো কোম্পানি যদি লাভ করেও ডিভিডেন্ড না দেয়, তাহলে শুধু “ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ” লিখে দায় এড়ানো যাবে না; অর্থ কোথায় ব্যয় হবে, তার স্পষ্ট পরিকল্পনা জানাতে হবে।

স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগেও বিস্তারিত শর্ত নির্ধারণ করেছে বিএসইসি। নতুন নিয়মে স্বতন্ত্র পরিচালককে বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে। তবে বহুজাতিক বা বিদেশি অংশীদারিত্ব থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকও নিয়োগ পেতে পারবেন। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন হবে।

স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে ব্যবসায়ী, করপোরেট নির্বাহী, সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক অথবা স্বীকৃত পেশাজীবীদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া যাবে। তাদের কমপক্ষে ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে নারী স্বতন্ত্র পরিচালকদের জন্য অভিজ্ঞতার ন্যূনতম সীমা রাখা হয়েছে ৮ বছর।

এছাড়া করপোরেট গভর্ন্যান্স ও সিকিউরিটিজ আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

কারা হতে পারবেন না স্বতন্ত্র পরিচালক

নতুন বিধিমালায় অযোগ্যতার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। কোম্পানির উদ্যোক্তা, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তা, ঋণখেলাপি ব্যক্তি, বাজার কারসাজিতে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশীদার কিংবা একই সঙ্গে তিনটির বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীরা এই পদে থাকতে পারবেন না।

এর মাধ্যমে “নামমাত্র স্বাধীন” পরিচালক নিয়োগের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আর্থিক প্রতিবেদনে দিতে হবে বিস্তারিত তথ্য

পরিচালনা পর্ষদের প্রতিবেদনে এখন থেকে শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, পণ্যভিত্তিক কার্যক্রম, পরিচালন ব্যয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন, আইপিও বা রাইট শেয়ারের অর্থ ব্যবহারের বিবরণ, আর্থিক ফলাফলের ওঠানামার কারণ এবং গত পাঁচ বছরের আর্থিক তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

একইসঙ্গে কোম্পানিকে লভ্যাংশ নীতি, সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার, স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণার কারণ এবং ইনসাইডার ট্রেডিংয়ে জড়িত না থাকার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের ঘোষণা দিলে
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন করপোরেট গভর্ন্যান্স রুলস ২০২৬ শুধু নিয়মের পরিবর্তন নয়—এটি শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের স্বচ্ছতা সংকট কাটিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি বড় পদক্ষেপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *