১০ টি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা পুরো খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে
দশটি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা পুরো খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
কারণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের চাপ সামলাতে গিয়ে রেকর্ড লোকসানে পড়েছে ব্যাংক খাত’
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছেই জমা হয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অন্যদিকে বাকি সব ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের মাত্র ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের মোট সম্পদের মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের অংশ ৪৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। টাকার হিসাবে এর পরিমাণ ১৩ লাখ ৫৩ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। বিপরীতে অন্যান্য ব্যাংকের হাতে রয়েছে ৫২ দশমিক ৭২ শতাংশ সম্পদ। আমানতের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। মোট আমানতের মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের অংশ ৪৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যার পরিমাণ ১০ লাখ ২৬ হাজার ২২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে অন্যান্য ব্যাংকে রয়েছে ৫১ দশমিক ৪১ শতাংশ আমানত।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের চিত্র আরও বেশি উদ্বেগজনক। মোট সম্পদের ৩১ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং আমানতের ৩২ দশমিক ১৭ শতাংশ থাকলেও খেলাপি ঋণের ৫১ দশমিক ৮৭ শতাংশই এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। অর্থাৎ দেশের মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকের বেশি মাত্র পাঁচটি ব্যাংকের হাতে জমা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে, যার পরিমাণ ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক, তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৬০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক ৩৩ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৩০ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ২৮ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংক ২৭ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ২৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ২২ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংক ১৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা।
এর বাইরে আরও কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ অত্যধিক বেশি। এগুলো হলো: এবি ব্যাংক ১৮ হাজার ১৯৩ কোটি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ১৬ হাজার ৭০৬ কোটি, সোনালী ব্যাংক ১৬ হাজার কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১০ হাজার ১৭৭ কোটি ও বেসিক ব্যাংকে ৮ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। তবে ভালো ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর উচ্চ মুনাফার কারণে সার্বিক খাতে এই লোকসান কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে এস আলমের মালিকানায় থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটি বিদায়ী বছরে ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এরপর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৩১ হাজার কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা ও ইউনিয়ন ব্যাংক ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
বিএবির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের মালিকানায় থাকা এক্সিম ব্যাংক ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা ও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানায় থাকায় আইএফআইসি ব্যাংক ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ও প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯৯২ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
