মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
আজকের সংবাদ

দর বাড়লেই শোকজ, কমলে নীরব ডিএসইর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন

২০১০ সালের ভয়াবহ শেয়ারবাজার ধসের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন অসংখ্য বিনিয়োগকারী। ওই ধসে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছেন অনেকে। লোকসানের ভার সইতে না পেরে কারও জীবনও ঝরে গেছে; কেউ আত্মহত্যা করেছেন, আবার কেউ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে সরকার বাজারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য নানা উদ্যোগ নিলেও শেয়ারবাজার এখনো প্রত্যাশিত গতিতে ফিরতে পারেনি।

মাঝেমধ্যে বাজারে স্থিতিশীলতার আভাস দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত আবারও দরপতনের বৃত্তে ফিরে এসেছে বাজার। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একপর্যায়ে বাজারে টানা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। এ সময় সূচকে রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি এবং লেনদেনেও উল্লেখযোগ্য গতি আসে। প্রধান সূচক প্রায় ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছালেও তা অতিক্রম করতে পারেনি। পরবর্তীতে আবারও ধারাবাহিক দরপতনে সূচক ও লেনদেন প্রায় তলানিতে নেমে আসে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজার নিয়ে নতুন করে কিছুটা আস্থার সংকট তৈরি হয়।

এর মধ্যেই গত সপ্তাহ থেকে শেয়ারবাজার ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারকে আবারও দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

তাদের অভিযোগ, বাজারের পরিস্থিতি যেমনই হোক, এর মধ্যেও বিনিয়োগকারীরা যখন কিছুটা মুনাফা করার সুযোগ পাচ্ছেন, তখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কিছু সিদ্ধান্ত সেই সুযোগে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে কোনো কোম্পানির শেয়ারদর টানা এক-দুই দিন বাড়লেই সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে দ্রুত শোকজ বা তদন্ত নোটিশ দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে অনেক সময় শেয়ারের স্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি থেমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিনিয়োগকারীদের ওপর।

বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ওরিয়ন ইনফিউশনের শেয়ারদর টানা পাঁচ কার্যদিবস বাড়ার পর কোম্পানিটিকে তদন্ত নোটিশ পাঠিয়েছে ডিএসই। অথচ এর আগে একই কোম্পানির শেয়ারদর টানা নয় দিন কমলেও সেই দরপতন ঠেকাতে ডিএসইর পক্ষ থেকে কোনো নোটিশ বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পাঁচ দিন দর বাড়তেই তদন্ত নোটিশ দেওয়ার ঘটনায় তাই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের বক্তব্য, কোনো কোম্পানির শেয়ারদর টানা কমতে থাকলে যদি ডিএসইর আপত্তি না থাকে, তাহলে শুধু দর বাড়ার সময়ই কেন নজরদারি বা শোকজ করা হবে—এটি বাজারের স্বাভাবিক গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, কোনো শেয়ারের টানা উত্থানের ক্ষেত্রে যদি তদন্ত বা শোকজ করা হয়, তাহলে ধারাবাহিক দরপতনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নজরদারি থাকা উচিত। কারণ দরপতনে বিনিয়োগকারীদের লোকসান বাড়ে, আর দর বাড়লে তারা সেই লোকসান কাটিয়ে মুনাফা করার সুযোগ পান।

বাজারসংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, ডিএসইর সার্ভিল্যান্স বিভাগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে কারা কী ধরনের লেনদেন করছেন, তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে। কোনো শেয়ারে অস্বাভাবিক বা বিতর্কিত লেনদেন হয়ে থাকলে কোম্পানিকে সামগ্রিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না করে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী বা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করছেন তারা।

তাদের মতে, কোনো কোম্পানির ব্যবসা বা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত সংবেদনশীল তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি তা নিয়ম অনুযায়ী ডিএসইকে জানিয়ে থাকে। ফলে কোনো শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যদি কোনো গোপন বা সংবেদনশীল তথ্য থাকে, সেটি যাচাই করা সম্ভব। আর যদি কোনো শেয়ারে বিতর্কিত লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে ডিএসইকে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না বলে অভিযোগ তাদের।

বাজারসংশ্লিষ্টদের দাবি, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই শেয়ারবাজারের উন্নয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ডিএসইকে ‘হটকারী’ ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আরও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে।

এদিকে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, শেয়ারদর ধারাবাহিকভাবে কমলে তাদের লোকসানের পরিমাণ বাড়তে থাকে। বিপরীতে বাজারে দর বাড়লে তারা আগের লোকসান কাটিয়ে মুনাফা করার সুযোগ পান। কিন্তু লোকসান ঠেকাতে ডিএসইর পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না বলে তাদের দাবি।

একজন বিনিয়োগকারী বলেন, ওরিয়ন ইনফিউশনের শেয়ার মুনাফার প্রত্যাশায় যে দরে কেনা হয়েছে, ডিএসইর তদন্ত নোটিশের পর যদি শেয়ারটির দর আবার কমে যায়, তাহলে মুনাফা করার পরিবর্তে নতুন করে লোকসানের মুখে পড়তে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ওই ক্ষতির দায় কে নেবে—এ প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

বিনিয়োগকারীদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নতুন করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। তাই ডিএসইর বর্তমান নিয়ম-নীতি ও নজরদারি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার।

তাদের দাবি, কোনো কোম্পানির শেয়ারদর যেমন অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে, তেমনি ধারাবাহিকভাবে দর কমলেও একইভাবে নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু শেয়ারদর বাড়লেই শোকজ বা তদন্ত নোটিশ পাঠানোর প্রবণতা বন্ধ করে বাজারে উত্থান-পতন উভয় ক্ষেত্রেই সমান নীতির প্রয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *