পাঁচ শতাংশ করছাড়ে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আসবে না: বক্তারা
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিতে বাধা দীর্ঘসূত্রতা, প্রণোদনার ঘাটতি ও ভয়ের পরিবেশ
শুধু পাঁচ শতাংশ করছাড় দিয়ে ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তাঁদের মতে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং বাস্তবতা বিবর্জিত নানা নিয়ম-কানুন থাকায় মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ দেখায় না। এর প্রমাণ, গত পাঁচ–ছয় বছরে কোনো উল্লেখযোগ্য কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি।
মঙ্গলবার (৮ জুলাই) বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত ‘পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ: টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন বক্তারা। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় শিল্পোদ্যোক্তা ও অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আমাদের শেয়ারবাজারে এমন কিছু নিয়ম ও বিধিনিষেধ রয়েছে, যেগুলো দেখে অনেক ভালো কোম্পানি ভয় পায়। এখানে এমনভাবে সবকিছু সাজানো, যেন কোনো কোম্পানি লোকসান করতেই পারে না। কিন্তু ব্যবসায় লাভ-লোকসান থাকবেই। বছর শেষে লভ্যাংশ দিতে না পারলেই জবাবদিহিতে পড়তে হয়। আবার আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা তুলতেও দেড়–দুই বছর সময় লেগে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে উল্লেখযোগ্য কোনো করসুবিধা পাওয়া যায় না। সম্পদের মূল্যায়নের ব্যবস্থা দুর্বল। সামান্য কিছু খারাপ লোকের কারণে পুরো বাজারে এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেন সবার হাত–পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
আলোচনায় জানানো হয়, কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা, সম্পদ মূল্যায়নের দুর্বলতা, উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব, ন্যূনতম শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা, সরাসরি তালিকাভুক্তিতে বৈষম্য এবং তালিকাচ্যুতির বিধান না থাকা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি এগিয়ে নিতে হলে অর্থবাজার ও পুঁজিবাজার—দুই পা–ই শক্ত করতে হবে। বিগত সরকার অর্থনীতিকে এমন অবস্থায় রেখে গেছে যে এখনো অনেক ব্যাংক তারল্যসংকটে রয়েছে। এই অবস্থায় পুঁজিবাজার হঠাৎ চাঙা হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সরকার এই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।’
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেয়ারবাজারকে সবসময় শিশু হিসেবে দেখে এসেছে। তাই গত ১৫ বছরেও এর নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। এই সময়কালে ১৩৮টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেও, সেগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।’
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী বলেন, ‘বাজারে পণ্যবৈচিত্র্য কম। নীতিগত অনেক কথা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবায়ন খুব কমই দেখা যাচ্ছে।’
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন বিএমবিএ সভাপতি মাজেদা খাতুন, সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ এ হাফিজ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাঈদ কুতুব, আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ এবং বিএসইসির পরিচালক আবুল কালাম। নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী ইফতেখার আলম।
বক্তারা বলেন, পুঁজিবাজারে সত্যিকারের ভালো কোম্পানি আনতে হলে কর–সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে, নীতিগত স্থিতিশীলতা আনতে হবে এবং কোম্পানিগুলোকে আস্থা দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। না হলে এই বাজার কখনোই টেকসই ভিত্তি পাবে না।
