শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
আজকের সংবাদ

বিনিয়োগকারীদের অর্থ-শেয়ার সুরক্ষায় বিএসইসির নতুন উদ্যোগ

পুঁজিবাজার প্রেস প্রতিবেদক: বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাৎ এবং আর্থিক অনিয়ম প্রতিরোধে দেশের সব ব্রোকারেজ হাউসকে একটি সমন্বিত ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যাংক হিসাব, সমন্বিত গ্রাহক হিসাব (সিসিএ) এবং শেয়ারসংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

বিএসইসির প্রত্যাশা, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্রোকারেজ হাউসের হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত অর্থ ও শেয়ারের পরিমাণের অসংগতি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে নজরদারিও জোরদার হবে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে বিএসইসি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। এতে সমন্বিত সফটওয়্যার চালুর সম্ভাব্য সুবিধা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, বাস্তবায়ন ব্যয় ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।

এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান ব্রোকারেজ হাউসে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রতিরোধে সমন্বিত ব্যাক অফিস সফটওয়্যার চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের সঙ্গে গ্রাহকদের হিসাবে দেখানো অর্থ নিয়মিত মিলিয়ে দেখা হলে ঘাটতি ও অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস আলাদা প্রতিষ্ঠানের তৈরি ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে। ফলে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে সব প্রতিষ্ঠানের হিসাব ও লেনদেন তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যারে দেখানো অর্থ বা শেয়ারের পরিমাণের সঙ্গে প্রকৃত স্থিতির অমিল থাকলেও তা শনাক্ত করতে সময় লাগতে পারে।

সমন্বিত সফটওয়্যার চালু হলে ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাংক হিসাবের স্থিতির সঙ্গে গ্রাহকদের হিসাবে দেখানো অর্থের মিল যাচাই করা যাবে। একইভাবে, ব্রোকারেজ হাউসের শেয়ারসংক্রান্ত তথ্য সিডিবিএলে সংরক্ষিত রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত অর্থ ও শেয়ারের পরিমাণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সহজ হবে।

কোনো হিসাবে ঘাটতি বা অসংগতি দেখা দিলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলো আগাম সতর্কবার্তা পেতে পারে। ফলে অনিয়ম বড় আকার ধারণ করার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ সুবিধা নিশ্চিত করতে সফটওয়্যারের সঙ্গে ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় শেয়ার সংরক্ষণব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা জরুরি।

সমন্বিত সফটওয়্যার চালুর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বাস্তবায়ন ব্যয়, বিদ্যমান সফটওয়্যার থেকে তথ্য স্থানান্তর এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা। যেসব ব্রোকারেজ হাউস বর্তমানে স্টক এক্সচেঞ্জের প্যানেলভুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, তাদের তথ্য স্থানান্তর, নতুন প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণে বাড়তি ব্যয় হতে পারে।

প্রস্তাবিত সফটওয়্যার কোনো স্টক এক্সচেঞ্জের কেন্দ্রীয় অবকাঠামোয় পরিচালিত হলে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি বা সাইবার হামলায় একসঙ্গে একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এতে লেনদেন-পরবর্তী হিসাব সমন্বয়, গ্রাহকসেবা ও অন্যান্য কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প সার্ভার, দুর্যোগকালীন তথ্য পুনরুদ্ধারব্যবস্থা, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা এবং নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সফটওয়্যার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে দক্ষ জনবল নিয়ে পৃথক ইউনিটও গঠন করতে হতে পারে। পাশাপাশি একটি সফটওয়্যার বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সমন্বিত সফটওয়্যার কার্যকরভাবে চালু হলে বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব অর্থ ও শেয়ারের স্থিতি যাচাই করা সহজ হতে পারে। ব্যক্তিগত নিরাপদ প্রবেশব্যবস্থা, তাৎক্ষণিক লেনদেনের বিজ্ঞপ্তি এবং হিসাবের পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড থাকলে অস্বাভাবিক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাবেন তাঁরা।

তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে হিসাব পর্যবেক্ষণ করতে পারলেই বিনিয়োগকারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই সুবিধা পাবেন না। এ জন্য গ্রাহকদের উপযোগী পৃথক ও নিরাপদ অনলাইন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি সফটওয়্যারে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক ও সিডিবিএলের প্রকৃত তথ্যের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

সমন্বিত সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ সফল হলে ব্রোকারেজ হাউসের হিসাব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তবে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির পাশাপাশি কার্যকর তদারকি, তথ্যের নিরাপত্তা এবং জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *