৩ মাসে আইপিও অনুমোদন, সহজ হচ্ছে ডাইরেক্ট লিস্টিং: বিএসইসি চেয়ারম্যান
দেশের পুঁজিবাজার সম্প্রসারণে আইপিও অনুমোদনের সময় কমানো, ডাইরেক্ট লিস্টিং সহজ করা এবং করপোরেট বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় রাজধানীর নিকুঞ্জে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ভবনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার নাফিজ আল তারিক, ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান।
প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক আল-আমিন, বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. শফিউল আজম, ডিএসইর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. মো. আসিফুর রহমান এবং বিএমবিএর সভাপতি ইফতেখার আলম।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারে আইপিও ও ডাইরেক্ট লিস্টিং বাড়াতে হবে। অতীতে একটি আইপিও অনুমোদনে এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লাগত। এ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে তিন মাসের মধ্যে আইপিও অনুমোদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে কমিশন।
আইপিও আবেদনের ক্ষেত্রে বিপুল কাগজপত্রের পরিবর্তে কোম্পানির মৌলিক বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানির অতীত আর্থিক অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, ব্যবসায়িক মডেল ও সুনামকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মাসুদ খান বলেন, আইপিও আবেদনের বিপুল কাগজপত্র যাচাইয়ের দায়িত্ব অডিটরদের ওপর দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিএসই, সিএসই ও বিএসইসির মধ্যে যাচাই প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হবে। বিএসইসির প্রশ্নগুলো ডিএসই বা সিএসইর মাধ্যমে করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের নতুন কাঠামো আগের মতো হবে না বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। নতুন মানদণ্ড অনুযায়ী সরকারি কোম্পানি, বহুজাতিক কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল ও সিসিবিএল ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের আওতায় আসবে। এ ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে টার্নওভার অথবা মোট সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি হলে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে। তবে যোগ্যতা অর্জন করলেই তালিকাভুক্তি নিশ্চিত হবে না বলেও জানান তিনি।
মাসুদ খান বলেন, অনেক বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানি আইপিওতে আসতে চায় না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অর্থের প্রয়োজন তুলনামূলক কম থাকলেও স্থানীয় কোম্পানিগুলো কমপ্লায়েন্সের বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে ডিজিটাইজেশনের কারণে ব্যবসার হিসাব আগের মতো গোপন রাখা সম্ভব হবে না।
দেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থার প্রসঙ্গে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বাজারের বড় সমস্যা হলো কম মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন। বাংলাদেশের বাজার মূলধন জিডিপির মাত্র ৬ শতাংশ। অন্যদিকে ভারতের মতো প্রতিবেশী বড় অর্থনীতিতে এ হার প্রায় ১৩০ শতাংশ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইক্যুইটি ট্রেডিং বাজার মূলধনের প্রায় শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ। পাকিস্তানে এ হার শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ হলেও তাদের দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ভারতে এ হার শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ, ভিয়েতনামে শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ।
মাসুদ খান বলেন, বাজার মূলধন বাড়লে লেনদেনের পরিমাণও বাড়বে। এতে বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বাড়বে এবং পুরো পুঁজিবাজারের পরিসর সম্প্রসারিত হবে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ভারতের পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশটিতে মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপনার পরিমাণ ৮৭ লাখ কোটি টাকা এবং অংশগ্রহণকারী প্রায় ২৮ কোটি। বাংলাদেশেও মিউচুয়াল ফান্ডকে জনপ্রিয় করতে এজেন্ট নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মাসুদ খান বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে খুচরা বিনিয়োগকারীর আধিপত্য বেশি। প্রায় ৯০ শতাংশ বিনিয়োগ খুচরা বিনিয়োগকারীদের। দেশের পুঁজিবাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীনির্ভর করে তুলতে হবে।
পুঁজিবাজারে ইক্যুইটির পাশাপাশি স্থির আয়ের বা বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করপোরেট বন্ড বাজার বড় এবং সেখানে পেনশন ফান্ডসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করে।
বাংলাদেশের ট্রাস্ট অ্যাক্ট পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের বিনিয়োগ কাঠামো পরিবর্তন করে শেয়ার, করপোরেট বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।
মাসুদ খান বলেন, আমরা ট্রাস্ট অ্যাক্টটাকে চেঞ্জ করব। তিনি জানান, করপোরেট বন্ড বাজার চালুর বিষয়ে বিএসইসি ও ডিএসই ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে। একটি বড় মেয়াদি বন্ড মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির পর্যায়ে রয়েছে। সেটি মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত হলে বন্ডের লেনদেন শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ ছাড়া নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালার আওতায় মিউচুয়াল ফান্ডের করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
মাসুদ খান বলেন, মার্জিন বিধিমালা, আইপিও ও ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং জনমত নেওয়া হয়েছে। ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের আগের প্রবিধানকে নতুন করে বিধিমালায় রূপ দেওয়া হয়েছে। দেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যতের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমানে বাজারে কম লেনদেনের প্রভাব তুলে ধরে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, লেনদেন কমে গেলে পুরো পুঁজিবাজারের ব্যবস্থাপনা কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্রোকার, ডিএসইসহ বাজারসংশ্লিষ্ট সবাই লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাজার মূলধন বাড়ানোর পাশাপাশি লেনদেন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
