আইপিও অর্থে অনিয়ম: ডমিনেজ স্টিলের ৫ পরিচালককে ৫ কোটি টাকা জরিমানা
প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, তথ্য গোপন ও জালিয়াতির অভিযোগে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ ঘটনায় কোম্পানিটির পাঁচ পরিচালককে ১ কোটি টাকা করে এবং সাবেক দুই কর্মকর্তাকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা।
বিএসইসির পরিদর্শন ও তদন্ত প্রতিবেদনে ডমিনেজ স্টিলের আইপিওর অর্থ ব্যবহারে একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। কোম্পানিটি ২০২০ সালে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। প্রতিটি ১০ টাকা মূল্যের ৩ কোটি শেয়ার ছেড়ে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, সংগৃহীত অর্থ ভবন নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন, প্ল্যান্ট ও মেশিনারিজ ক্রয় এবং আইপিও-সংক্রান্ত খরচে ব্যবহারের কথা ছিল।
তদন্তে দেখা যায়, আইপিওর অর্থ ব্যবহারের খাত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পূর্বানুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন করে এবং জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রক্সি ভোট সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
আইপিওর অর্থ ব্যবহারের অন্যতম আলোচিত অনিয়মের ঘটনা ঘটে ড্রেজার কেনার ক্ষেত্রে। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘সিএসডি ডমিনেজ-৩’ নামের একটি ড্রেজার কেনা হয়। ২০২১ সালে কেনার পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছরেও ড্রেজারটি থেকে কোনো ব্যবসায়িক আয় হয়নি বলে বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে আরও বলা হয়েছে, কেনার পর ড্রেজারটি কোনো ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হয়নি।
ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক ও মূল্য নিয়েও তদন্তে প্রশ্ন ওঠে। কোম্পানির নথিতে ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক হিসেবে সুন্দরবন শিপবিল্ডার্সের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি লিখিতভাবে বিএসইসিকে জানিয়েছে, তারা ওই ড্রেজার তৈরি করেনি। ফলে ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক সম্পর্কে কোম্পানির দেওয়া তথ্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও নরসিংদীর পলাশে অবস্থিত কোম্পানির দুটি কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার তথ্যও তদন্তে উঠে আসে। বিএসইসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানাগুলো বন্ধ থাকার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, এ ধরনের তথ্য মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
তদন্তে আশুলিয়ার কারখানার শেড সম্প্রসারণের নির্মাণ ব্যয় নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। বিএসইসির তদন্তে নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখিয়ে আইপিওর অর্থ থেকে প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অনিয়মের ঘটনায় ডমিনেজ স্টিলের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, পরিচালক সুজিত সাহা, পরিচালক রকিবুল ইসলাম এবং পরিচালক আবুল কালাম ভূঁইয়াকে প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা করে জরিমানা করেছে বিএসইসি। একই সঙ্গে কোম্পানিটির সাবেক প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. জিল্লুর রহমান এবং সাবেক কোম্পানি সচিব মো. জামির হোসেন চৌধুরীকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, জরিমানার অর্থ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে কমিশনে জমা দিতে হবে।
ডমিনেজ স্টিলের পরিশোধিত মূলধন ১০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং মোট শেয়ার সংখ্যা ১০ কোটি ২৬ লাখ। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে ৩০ দশমিক ২০ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে দশমিক ০২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৬১ দশমিক ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
বিএসইসির তদন্তে উঠে আসা এসব অনিয়মের ভিত্তিতে কোম্পানিটির সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মোট ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আইপিওর অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার, বিনিয়োগকারীদের সঠিক তথ্য জানানো এবং শেয়ারবাজারের বিধিবিধান অনুসরণের বিষয়টি এ ঘটনার মাধ্যমে আবারও সামনে এসেছে।
