মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬
আজকের সংবাদ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগেও পতন থামেনি, বিএসইসি পুনর্গঠনের দাবি

পুঁজিবাজার প্রেস প্রতিবেদক :  দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিল সুবিধার মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্তও বাজারের পতন ঠেকাতে পারেনি। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন ইতিবাচক উদ্যোগের পরদিন মঙ্গলবার (০৩ নভেম্বর) দেশের উভয় শেয়ারবাজারে দরপতনের মাত্রা আরও বেড়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা ও আস্থার সংকট নতুন করে গভীর হয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই ইতিবাচক সিদ্ধান্তের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে বর্তমান কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নতুন নেতৃত্বে কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সোমবার (০২ নভেম্বর) বিশেষ তহবিল সুবিধার মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ সুবিধার মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলো আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশেষ তহবিলের আওতায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ পাবে।

 

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তকে বাজারের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখেছিলেন বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা ছিল, বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা বজায় থাকবে এবং বাজারে নতুন করে অর্থপ্রবাহ বাড়বে। এতে দীর্ঘদিনের দরপতন কাটিয়ে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরদিনই বড় দরপতন হওয়ায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। উল্টো বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শেয়ারবাজার মূলধনসংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণের কারণে চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন না ঘটায় বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস মহামারির সময় শেয়ারবাজারে তীব্র তারল্যসংকট মোকাবিলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশেষ তহবিল গঠনের নীতিমালা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নীতিমালার আওতায় প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক নিজস্ব অর্থায়ন অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেপো সুবিধার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারে।

এই সুবিধার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিশেষ তহবিল থেকে শেয়ারবাজারে করা বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর প্রচলিত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগসীমা বা এক্সপোজার লিমিটের বাইরে রাখা হয়। ফলে ব্যাংকগুলো নির্ধারিত বিনিয়োগসীমার অতিরিক্ত হিসেবে এই তহবিলের অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ পায়।

 

 

 

তবে শুধু মেয়াদ বাড়ানো নয়, শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিশেষ তহবিলের পরিমাণও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) প্রতিটি ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের সীমা ২০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনটি এ সুবিধার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০৩১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের পরও শেয়ারবাজারে দরপতন অব্যাহত থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ।

তাদের বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে নতুন করে বড় দরপতন কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। বিশেষ করে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে বাজারে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম চলছে। এর মধ্যেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে না পারা উদ্বেগজনক।

বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ধারাবাহিক দরপতন নিয়ন্ত্রণে বর্তমান কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বাজারে আস্থা ফেরাতে দৃশ্যমান উদ্যোগের অভাব রয়েছে। কেন কমিশন পতন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না কিংবা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান জানাচ্ছে না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তাদের মতে, বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রীকে পরিবর্তন করেছেন উল্লেখ করে তারা বলেন, একই ধারাবাহিকতায় শেয়ারবাজারের স্বার্থে বর্তমান কমিশন পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।

বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের সমন্বয়ে নতুন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সমস্যা ও প্রত্যাশা সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করতে বিনিয়োগকারী সংগঠনের যোগ্য প্রতিনিধিদের কমিশনের পরামর্শক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা আরও কার্যকর ধারণা পাবেন বলে মনে করছেন তারা।

 

 

 

 

ডিএসইতে সব সূচকের পতন, বেড়েছে লেনদেন

এদিকে, মঙ্গলবার (০৩ নভেম্বর) সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সব মূল্যসূচকের পতন হয়েছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। তবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় টাকার অঙ্কে লেনদেন বেড়েছে।

ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, মঙ্গলবার প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪৯ দশমিক ২৬ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২৮৪ দশমিক ৩১ পয়েন্টে নেমে এসেছে।

একই দিনে শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ৭ দশমিক ৫১ পয়েন্ট হারিয়ে ১ হাজার ৩০ দশমিক ২৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, বাছাই করা ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ২০ দশমিক ২৮ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২১ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে।

এদিন ডিএসইতে মোট ৩৮৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে মাত্র ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে। বিপরীতে ২৬৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। আর ৫১টি প্রতিষ্ঠানের দর আগের দিনের অবস্থানে অপরিবর্তিত রয়েছে।

লেনদেনের পরিমাণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, মঙ্গলবার ডিএসইতে প্রায় ৫৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪১৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক কার্যদিবসের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

অর্থাৎ টাকার অঙ্কে লেনদেন বাড়লেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতন এবং সব সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা বাজারের দুর্বল পরিস্থিতিকেই সামনে এনেছে।

 

 

 

 

সিএসইতেও বড় দরপতন, কমেছে লেনদেন

অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) মঙ্গলবার নেতিবাচক প্রবণতায় লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমার পাশাপাশি টাকার অঙ্কে লেনদেনও হ্রাস পেয়েছে।

সিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, মঙ্গলবার এক্সচেঞ্জটিতে মোট ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকার। ফলে এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

এদিন সিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৪৫টির শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে। বিপরীতে ১১২টির দর কমেছে এবং ৮৪টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

অন্যদিকে, সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৭৪ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ২১৪ দশমিক ৭০ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আগের কার্যদিবসেও সূচকটি ১০৪ দশমিক ৬০ পয়েন্ট কমেছিল। ফলে টানা দুই কার্যদিবসে সিএসইর সার্বিক সূচকে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বাড়ানোর মতো ইতিবাচক সিদ্ধান্তের পরও উভয় শেয়ারবাজারে দরপতন অব্যাহত থাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এ পরিস্থিতিতে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *