মজুরি আন্দোলনে অচল পোশাকশিল্প, বন্ধ ৫২৯ কারখানা
পুঁজিবাজার প্রেস প্রতিবেদক : ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতায় দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। রোববার এক দিনেই সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা।
এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পোশাক রপ্তানির সর্বোচ্চ মৌসুমে এমন অস্থিরতা দেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
সাধারণত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ পাওয়ার প্রধান সময়। এ সময়ে পুরো বছরের মোট রপ্তানি কার্যাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে।
কিন্তু ঠিক এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের পোশাকশিল্প।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নতুন করে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ জানিয়েছে, সোমবারও শ্রমিকরা কাজে না ফিরলে শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
গত কয়েক দিন ধরে উত্তরা ও মিরপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে বিক্ষোভ করে আসছিলেন। শনিবার থেকে সেই আন্দোলন আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। রোববার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রূপ নেয়।
রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া, কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যদের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কারখানা মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে অন্তত ২০টি মাঝারি ও বড় কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই উন্নত কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য পরিচিত।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ ও পর্যালোচনার জন্য ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
এদিকে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রী, শ্রম উপদেষ্টা এবং অন্যান্য মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন।
বৈঠকে কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠক শেষে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে একটি মহল অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। এসব তৎপরতা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভোগান্তিতে পড়েন হাজার হাজার যাত্রী।
সকাল সোয়া ১১টার দিকে পুলিশ শ্রমিকদের সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। দুপুর ২টার পর সংঘর্ষের তীব্রতা কমে এলে অবরুদ্ধ সড়কগুলোতে ধীরে ধীরে যান চলাচল শুরু হয়।
অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকায় বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকরা প্রথমে কারখানায় প্রবেশ করলেও কিছুক্ষণ পর কাজ বন্ধ করে লাঠিসোঁটা নিয়ে মহাসড়কে নেমে আসেন।
হাজার হাজার শ্রমিক সড়কে অবস্থান নেওয়ায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে স্থানীয় ও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়।
কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ তরিকুল ইসলাম জানান, পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা একটি কারখানার গুদামসহ তিনটি স্থানে আগুন ধরিয়ে দেন।
এ ছাড়া কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা একটি পুলিশ বক্স এবং আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের দীর্ঘ প্রচেষ্টা এবং আলোচনার পর বিকেল ৩টার দিকে শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে যেতে শুরু করেন।
একই সময়ে সাভারের হেমায়েতপুরে একেএইচ গ্রুপসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। অন্যদিকে আশুলিয়ার ৫০টির বেশি কারখানায় একযোগে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা জেলা ট্রাফিক পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিকেল ৩টায় শ্রমিকরা হেমায়েতপুর এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নিলে ঢাকা-আরিচা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ কর্মকর্তাদের বারবার অনুরোধ ও আশ্বাসের পর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শ্রমিকরা অবরোধ তুলে রাস্তার পাশে সরে যান।
এর আগে হেমায়েতপুরে একেএইচ গ্রুপের কারখানার প্রধান ফটকের পাশের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে চেয়ার ও বাঁশ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ। কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হলে কাচের প্যানেল ভেঙে যায়। এ সময় কারখানা চত্বরে থাকা কয়েকটি যানবাহনও ভাঙচুর করা হয়।
আগস্ট-সেপ্টেম্বরের তুলনামূলক কম ব্যস্ত সময় পার করে এখন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগামী গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের জন্য পোশাকের ক্রয়াদেশ দেওয়া, প্রাথমিক আলোচনা ও কারখানা পরিদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক এমন সময়ে শ্রম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা।
কারখানা মালিকদের আশঙ্কা, চলমান অস্থিরতায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্রয়াদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর কারখানায় চলে যেতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি ক্রেতাদের একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করে বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করছেন।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, রোববার দেশের অন্তত ৫২৯টি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা উৎপাদন শুরু না করেই কারখানা থেকে বেরিয়ে যান। ফলে মালিকপক্ষ উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।
কারখানায় ভাঙচুর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার মতো ঘটনায় কারখানা মালিক, সরকারি কর্মকর্তা ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। এ শিল্পে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক।
শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ চলার সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় ইউরোপের একটি দেশের ক্রেতা প্রতিনিধিদল পরিদর্শনে ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কারখানার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিক্ষোভের কারণে প্রতিনিধিদলটি দীর্ঘ সময় কারখানার ভেতরে আটকে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের কোনো সমস্যা না হলেও বাংলাদেশের বিষয়ে তাঁদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জভিত্তিক ফকির ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ বলেন, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ পর্যন্ত পোশাকের ক্রয়াদেশ পাওয়ার প্রধান মৌসুম। সারা বছরের মোট রপ্তানি কার্যাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ এ সময় আসে।
তাঁর মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে শ্রম অসন্তোষ দেশের পোশাকশিল্পের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। যেসব বিদেশি ক্রেতা ক্রয়াদেশ বাড়ানো কিংবা নতুন করে কার্যাদেশ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তাঁরাও বর্তমান পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পোশাকশিল্প মালিকরা।
রোববার শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে বিজিএমইএর উত্তরা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন কারখানা মালিক।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, রোববার মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাই সোমবার থেকে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। এরপরও শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিলে প্রতিদিন কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে শ্রমিক নেতাদের একাংশ চলমান পরিস্থিতির জন্য মজুরি বোর্ড গঠনে সরকারের বিলম্বকে দায়ী করছেন। তাঁদের দাবি, গত দুই মাস ধরে তাঁরা নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন।
ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। আগেই বোর্ড গঠন করা হলে বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো তৈরি হতো না।
এদিকে শ্রমিক নেতারা সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং বিভিন্ন এলাকায় অস্থিরতা বেড়েছে। এতে কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে নেতাদের যোগাযোগ, তাঁদের প্রতি শ্রমিকদের আস্থা এবং আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে নেতাদের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
