বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৬
কোম্পানি সংবাদ

১২ প্রতিষ্ঠান হাজার কোটি টাকা নিঃশেষ করেছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের

তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল) দেউলিয়া হওয়ার পথে। নজিরবিহীন ঋণ কেলেঙ্কারি এবং গ্রাহকের আমানত হারানোর কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পথ হারিয়ে ফেলেছে।

প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার) ছাড়াও আরও কয়েক ডজন কোম্পানি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০০০ কোটি টাকা চুরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান একেএম শহীদ রেজা ও প্রাইম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীর মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো।

হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে আইএলএফএসএলে-এ একটি নিরপেক্ষ বোর্ড স্থাপন করা হলেও, গ্রাহকদের জমা করা প্রায় সমস্ত অর্থই কেটে গেছে। বোর্ড এখন টাকা ফেরত চাইলে খেলাপিরা উল্টো হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর কেউ কেউ ঋণের প্রায় পুরো টাকা মেরে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

আইএলএফএসএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “আমাদের খেলাপি ঋণ অনেক বেশি। আমরা তা আদায়ের চেষ্টা করছি। ঋণখেলাপিরা বলছেন, আমরা তাদের খেলাপি বাড়াচ্ছি। বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ, আমরা যদি আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকি। এর দায়দায়িত্ব আমাদের উপর বর্তাবে।আশা করি ভবিষ্যতে আমাদের ঋণ আদায় বাড়বে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, ঋণ কেলেঙ্কারিতে বর্তমানে প্রায় পুরো ব্যাংক ও আর্থিক খাতই প্রশ্নবিদ্ধ। পরিচালকরা পরস্পরের ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য ষড়যন্ত্র করছেন। এরই মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের আমানত বেনামে লুটপাটের কারণে দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রায় দেউলিয়া হয়ে গেছে। এভাবেই আইএলএফএসএল ঝুঁকিতে রয়েছে।

জানা গেছে, আইএলএফএসএলের মোট ঋণের ৯১ শতাংশ বা ৩ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা খেলাপি রয়েছে ৪ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। মাত্র ১২টি কোম্পানি প্রায় ১০০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর আগে পিকে হালদার একাই কোম্পানির ১৬০০ কোটি টাকা লুট করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. মাজবাউল হক গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুমতি দেয়। তাদের কর্মকাণ্ডে ত্রুটি থাকলে সেগুলো দেখভালের জন্য পর্যবেক্ষক দেওয়া হয়। এরপরও কেউ অপরাধ করলে তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে।

আইএলএফএসএল সূত্রে জানা গেছে, একেএম শহীদ রাজার মালিকানাধীন পদ্মা উইভিং লিমিটেড আইএলএফএসএল থেকে ১১৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। বর্তমানে এর পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা। শহিদ রেজা ঋণ পুনঃতফসিল করলেও বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় কর্তৃপক্ষ আদালতে যাওয়ার কথা ভাবছে।

এদিকে, আজম জে চৌধুরীর মালিকানাধীন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিএফআই সিকিউরিটিজ ৪০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একবার পুনঃনির্ধারিত হলে, ঋণ পরিশোধে পিএফআই সিকিউরিটিজ ডিফল্ট হয়। বর্তমানে মোট ঋণ ১০৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ঋণ আদায়ের জন্য মানি ডেট কোর্ট-২ এ ১টি মামলা, চেক অসম্মান সংক্রান্ত ১৯টি এবং ঢাকার সিএমএম আদালতে ১টি চেক জালিয়াতির মামলা হয়েছে। এরপরও টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো অগ্রগতি নেই।

বর্ণালী ফেব্রিকস লিমিটেড ঋণ নিয়েছে রুপি। ২৫ কোটি টাকা। স্ট্যাটাস দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এম এ রশিদ এখন যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক।

বেনেটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ঋণ নিয়েছে ২৮৮৫ মিলিয়ন টাকা। এখন তা দাঁড়িয়েছে ৪০ কোটি টাকায়। পাওনা আদায়ের জন্য ঢাকার অর্থ আদালত-২ এ মামলা হয়েছে। বেনেটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি এম এ বারী প্রকৌশলী এম এ রশিদ বে.

মদিনা টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ঋণ নিয়েছে ৭ কোটি টাকা। বকেয়া আছে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ঋণ আদায়ে চারটি মামলা হয়েছে।

মোস্তফা গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট চট্টগ্রামের রহমান শিপব্রেকার্স লি. এবং এমএম শিপ ব্রেকার্স লিমিটেডের দুটি অ্যাকাউন্টে ১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। খেলাপির কারণে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭৫ মিলিয়ন টাকা। মূল প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হেফাজুতুর রহমান ঋণ পরিশোধে খেলাপি। তার বিরুদ্ধে চেক অনার মামলাও চলছে।

রহমান কেমিক্যালস ঋণ নিয়েছে ৫০ কোটি টাকা; এখন ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। সিমটেক্স টেক্সটাইল ঋণ নিয়েছে ৫৭৫ মিলিয়ন টাকা; এখন তা দাঁড়িয়েছে ৭৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ইমার এন্টারপ্রাইজ 28 কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে; এখন বকেয়া আছে ৬৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। G&G এন্টারপ্রাইজ 30 কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে; এখন তা দাঁড়িয়েছে ৭৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। কমপ্লিট এডুকেশন অ্যান্ড অল্টারনেটিভ ফাউন্ডেশন ঋণ নিয়েছে ১১ কোটি টাকা; এখন তা ৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সামনাজ সুপার অয়েল লিমিটেড ঋণ নিয়েছে ৩০ কোটি টাকা; সুদের সাথে বকেয়া 70 কোটি টাকা। এমএসটি ফার্মা অ্যান্ড হেলথকেয়ার লিমিটেড ৬০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে; এখন তা দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে আন্তর্জাতিক লিজিংয়ের মোট ঋণ ৯৩৪ কোটি টাকার বেশি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যারা অর্থ পাচার ও লুটপাট করে তাদের বিচারের আওতায় আনতে সময় লাগে। অনেক অপরাধী আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যায়। তাই একই অপরাধ বারবার ঘটছে। এভাবে চলতে থাকলে অর্থনীতি ব্যাহত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *